রয়টার্সের কলাম/পুঁজিবাদের পুরোনো নিয়মকে অচল করে দিয়ে মাস্ক যেভাবে ট্রিলিয়নিয়ার

ইলন মাস্ক এখন বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখো কোটিপতি। গত শুক্রবার ন্যাসডাকে স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে আসতেই নতুন ইতিহাস গড়লেন তিনি।
স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মাস্কের এই মহাকাশ গবেষণা ও স্যাটেলাইট কোম্পানির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। মাস্কের নিজের সম্পদ এখন এক ট্রিলিয়ন বা লাখো কোটি ডলারের আকাশ ছুঁয়েছে।
পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এটি আমাদের কী বার্তা দেয়?
বার্তাটি খুব পরিষ্কার—স্কুলে আমরা পুঁজিবাদের যে নিয়ম শিখেছি, তা এখন আর কার্যকর নেই। সরবরাহ আর চাহিদার ভিত্তিতে এখন আর পণ্যের দাম ঠিক হয় না। আধুনিক পুঁজিবাদ এখন দাঁড়িয়ে আছে প্রচারের ডামাডোল, ক্ষমতাশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ আর একতরফা নিয়ন্ত্রণের ওপর।
প্রথমেই আসা যাক প্রচারের কথায়। ২০২৫ সালে স্পেসএক্সের মোট আয়ের চেয়েও ১০০ গুণ বেশি দাম ধরা হয়েছে এর শেয়ারের। এটিকে দুঃসাহস বললেও কম বলা হয়। কারণ কোম্পানিটি ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে এবং আগের অনেক লক্ষ্য পূরণ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। মহাকাশ ভ্রমণ বা ভিনগ্রহে বসতি গড়ার মতো কাল্পনিক ও অনিশ্চিত স্বপ্নের ওপর ভর করেই এই ব্যবসা চলছে।
স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে আসা মাস্কের ওপর এক অন্ধ বিশ্বাসের প্রতিফলন। মাস্ক নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি এক্সএআইয়ের সঙ্গে স্পেসএক্সের একটি চুক্তি করিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি চুক্তিটি করেছেন নিজের সঙ্গেই।
এটি যেন জাদুকরের এক তেলেসমাতি। স্পেসএক্সের এই কারবার মাস্কের সেই ডজকয়েন বা ট্রাম্পের ক্ষমতা দখলের মতোই একতরফা। এখানে কোনো জবাবদিহি নেই, নেই কোনো ভারসাম্য। সব চলবে মাস্কের একচ্ছত্র ইচ্ছায়।
এবার আসা যাক প্রভাব ও যোগাযোগের কথায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কারের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তিনি শুরু থেকেই মাস্কের বড় সমর্থক। মাস্কের পরামর্শেই ট্রাম্প তাকে এই পদে বসিয়েছেন।
ব্রেন্ডন কারের কল্যাণে মাস্ক এখন পৃথিবীর কক্ষপথের দুই-তৃতীয়াংশ স্যাটেলাইটের মালিক। গ্লোবাল ইন্টারনেট আর প্রতিরক্ষা যোগাযোগের ওপর এখন মাস্কের একচ্ছত্র আধিপত্য। এমনকি মাস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করেছেন এই ব্রেন্ডন কার।
স্পেসএক্সের ওপর মাস্কের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নিরঙ্কুশ। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো কথা বলার সুযোগ থাকবে না। মাস্কের একটি শেয়ারের ভোটের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের ১০টি শেয়ারের সমান। সেখানকার পরিচালনা পর্ষদ কেবল পুতুলের মতো বসে থাকবে। তাদের হাতে কোনো বাস্তব ক্ষমতা নেই।
বিনিয়োগকারীরা যদি নিজের ইচ্ছায় এই ঝুঁকি নিতেন, তবে কথা ছিল না। কিন্তু আমাদের অনেকের সঞ্চয় বা পেনশনের টাকা এখন আমাদের অজান্তেই স্পেসএক্সে বিনিয়োগ হয়ে যাবে।
কারণ পুঁজিবাজারের নিয়মগুলো মাস্ক নিজের মতো বদলে নিয়েছেন। সাধারণত নতুন কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার পর কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু ন্যাসডক ১০০ তাদের নিয়ম বদলে ফেলেছে। এর ফলে মার্কিন জনগণের পেনশনের টাকা আর সঞ্চয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পেসএক্সের শেয়ারে ঢুকে যাবে। এর মাধ্যমে মাস্ক কৃত্রিমভাবে স্পেসএক্সের দাম বাড়িয়ে তুলছেন।
সবচেয়ে বড় চালটি হলো, স্পেসএক্সের ভেতরের মানুষগুলো খুব দ্রুত তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারবেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন সূচকের নিয়মে শেয়ার কিনতে বাধ্য হবেন, তখন মাস্ক আর তার বন্ধুরা উচ্চ দামে শেয়ার বিক্রি করে সটকে পড়বেন। সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারবে না তারা কীভাবে শোষণের শিকার হলো।
আমি নৈরাশ্যবাদী হতে চাই না, কিন্তু মার্কিন পুঁজিবাদের কেন্দ্রে এখন পচন ধরেছে। সাধারণ মানুষের সম্পদ এখন মাস্ক ও তার বন্ধুদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এটি আধুনিক আমেরিকার এক নগ্ন বাস্তবতা।
লেখক পরিচিতি: রবার্ট রাইখ, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির বার্কলে ক্যাম্পাসের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক। যিনি ক্লিনটন প্রশাসনের শ্রমসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন
.png)

