logo

ইসরায়েলের নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার পেছনে আরেক লক্ষ্য

ইসরায়েলের নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার পেছনে আরেক লক্ষ্য

সম্প্রতি ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে দ্য হেগ গ্রুপকে উদ্দেশ করে একটি বার্তা দিয়েছে। এই জোটে দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন সার্বভৌম দেশ রয়েছে। তারা গাজায় আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা করতে দ্য হেগে জরুরি বৈঠকে অংশ নিয়েছিল। ওই পোস্টে ৪০টি অংশগ্রহণকারী দেশের একটি ছবি ও একই দিনে ডুবে যাওয়া ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে ঘন-কালো ধোঁয়া ওঠার ছবিও প্রকাশ করা হয়। আর ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আমরা আশা করতে পারি হেগ বৈঠকের ফলাফল ইরানের নৌবাহিনীর মতোই সফল হবে।’

পোস্টটি ইসরায়েলের সরকারি মন্ত্রণালয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা হয়েছে। এখনও তা সরানো হয়নি। এতে চলমান সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, বোমা হামলা শেষ হলে সরকার ‘তাদের দখলে’ থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের ছবির সঙ্গে ডুবে যাওয়া যুদ্ধজাহাজের ছবি ব্যবহার করা অনেকের কাছে কেবল উসকানিমূলক নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে আলোচনা করা দেশগুলোর প্রতি কড়া বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দ্য হেগ গ্রুপ গ্লোবাল সাউথ কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় দ্য হেগ গ্রুপ। এর প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, হন্ডুরাস, মালয়েশিয়া, নামিবিয়া, সেনেগাল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) অস্থায়ী নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পদক্ষেপ সমন্বয় করা।

জোটটি তাদের কর্মকাণ্ডকে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে ইসরায়েল কূটনৈতিক বৈঠককে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে তুলনা করে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সমালোচকদের মতে তা প্রক্রিয়া ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের জবাবদিহিতা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য—এই ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ এই জোটের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ইসরায়েলের পোস্ট অনুযায়ী, এটি আর কোনো ‘বিচ্ছিন্ন’ ছোট গোষ্ঠী নয়। বরং ব্রাজিল ও সৌদি আরবের মতো জি২০ সদস্য, স্পেন ও নরওয়ের মতো ইউরোপীয় দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশ আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হয়েছে।

গত ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকের চূড়ান্ত বিবৃতিতে উপস্থিত ৪০টি দেশ ‘কথা থেকে কাজে’ অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানায়। দ্য হেগ গ্রুপ প্রস্তাব দেয়, ইসরায়েলি বসতিগুলোর পণ্য আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাতে হবে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলে সব ধরনের অস্ত্র, সামরিক জ্বালানি ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী স্থানান্তর বা পরিবহন বন্ধ করতে হবে।

আরেকটি নতুন পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েলি নথি ব্যবহার করে ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ তথ্য প্রকাশের নিয়ম চালুর কথা বলা হয়। এর ফলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) কাজ করা ব্যক্তিরা অন্য দেশে প্রবেশের সময় জাতীয় যুদ্ধাপরাধ আইনের অধীনে ‘সেকেন্ডারি স্ক্রিনিং’য়ের মুখোমুখি হতে পারেন। জোটের যুক্তি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আইসিজের উপদেষ্টা মতামতে যে ‘তৃতীয়-রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা’ উল্লেখ করা হয়েছে, তা পূরণ করতেই এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে পোস্ট করে জোটটিকে ‘ঘৃণায় ঐক্যবদ্ধ দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা’ বলে সমালোচনা করে। তবে এই বিতর্কের পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের সময় দক্ষিণ আফ্রিকা যখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন ইসরায়েল তাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। দুই দেশের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি ও পারমাণবিক সহযোগিতাসহ গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালের ভেলা ঘটনার কথাও প্রায়ই উল্লেখ করা হয়, যেটিকে অনেক বিশ্লেষক দক্ষিণ আটলান্টিকে ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ পারমাণবিক পরীক্ষা বলে মনে করেন।

যদিও এই ইতিহাস সরাসরি আইসিজের সামনে থাকা আইনি প্রশ্নগুলোর সমাধান করে না। তবে এটি বর্তমান আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অবস্থানকে জটিল করে তোলে। কারণ, আজ যে দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের জন্য জোর দিচ্ছে, তাদের অনেকেই অতীতে দীর্ঘ সময় ইসরায়েলকে ঘিরে দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে আরেকটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার পর পাহলভি রাজবংশের উত্তরাধিকারী রেজা পাহলভি আবার আলোচনায় আসেন। তিনি হামলাকে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলের গোয়েন্দা মন্ত্রীর আমন্ত্রণে দেশটি সফরে যান পাহলভি। সেসময় ইসরায়েল ও ইরানের জনগণের মধ্যে ‘প্রাচীন বন্ধন’ পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য ‘সাইরাস চুক্তি’ ধারণা তুলে ধরেন তিনি।

পাহলভি আমলে ইরান বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার ছিল। ১৯৭৮ সালের মধ্যে ইরান দক্ষিণ আফ্রিকার অপরিশোধিত তেল আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করত। ফলে প্রিটোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম হাতিয়ার (আরব তেল নিষেধাজ্ঞা) প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। পাহলভি পরিবারের ইতিহাসেও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কের ছাপ রয়েছে; রাজপরিবারের পূর্বসূরি রেজা শাহ ১৯৪৪ সালে জোহানেসবার্গে নির্বাসনে মারা যান।

কিছু দেশে আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা করা হয় না। এই দ্বৈত মানদণ্ডের বিরুদ্ধেই দ্য হেগ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। গত ৪ মার্চের বিবৃতিতে তারা বলেছে, এখন দেশগুলোর সামনে দুটি পথ আছে। একটি রাজনৈতিক জটিলতার কারণে চুপ থাকা, অথবা সবার জন্য সমানভাবে আন্তর্জাতিক আইন মানার পক্ষে দাঁড়ানো।

জোটটি সতর্ক করেছে যে, দেশগুলো যদি এখনই বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর না করে, তাহলে বিশ্বে যে আইনভিত্তিক ব্যবস্থা আছে তা মূল্যহীন হয়ে যাবে। তাদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে হওয়া কূটনৈতিক বৈঠকের ফলাফলকে সামরিক হামলা বা ডুবন্ত জাহাজের মতো ঘটনাকে ‘সাফল্য’ হিসেবে দেখিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান ও বিশ্বাস আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

দ্য হেগ গ্রুপ বলছে, বর্তমান সময়ে বিশ্বে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই শক্ত ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মগুলো শুধু কাগজে থাকবে, বাস্তবে আর কার্যকর হবে না।

লেখক: দক্ষিণ আফ্রিকার মানবতাবাদী নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আল-জাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত