আলজাজিরার কলাম/আইসিসি-কে ট্রাম্প ধ্বংস করবেন না

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আবারও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মুখে পড়েছে। ওয়াশিংটনের এই প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টার পেছনের কারণটি সহজ; যুক্তরাষ্ট্র যেন পুরোপুরি ‘দায়মুক্তি’ উপভোগ করে, সেটাই তাদের জেদ। অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন নাগরিকদের আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র তার নৃশংসতার জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন না হতো, তবে তারা এই আদালতকে ধ্বংস করতে চাইত না।
এখন আইসিসির সমর্থকদের রুখে দাঁড়ানোর সময়। আইসিসির প্রতি মার্কিন আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আদালতের কাজকে ব্যাহত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্সি থেকে রিপাবলিকানরা বিশেষভাবে এই আদালত ও এর কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত।
সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন থেকে শুরু করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পর্যন্ত রিপাবলিকান কর্মকর্তারা আইসিসির ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। যদিও আদালতটি কোনো আমেরিকান নাগরিকের বিরুদ্ধে কখনো পরোয়ানা জারি করেনি।
প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন কর্মকর্তাদের আইসিসি-কে নিন্দা করার প্রচেষ্টা প্রতিষ্ঠানটিকে মর্যাদা ও বৈধতা দিয়েছে। সারা বিশ্বের তাদের কাছে যারা মনে করেন যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে আইসিসি দুর্বল, তাদের জন্য একের পর এক রিপাবলিকান প্রশাসনের এই ক্ষোভ একটি শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
সহজে বললে, আইসিসি নিয়ে ওয়াশিংটনের উন্মাদনা যত বাড়বে, আদালতটি তাদের কাছে তত বেশি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে, যারা বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
রাজনৈতিক মহল থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করার প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি বৈশিষ্ট্য এবং এটি সব সময়ই ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন মনে হচ্ছে। আইসিসি কর্মীদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সামগ্রিকভাবে আদালতকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি রুবিওর ভাষায় একে ‘ইটের পর ইট’ খুলে ফেলার হুমকি চরম উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয় এবং আইসিসি-র জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আদালতকে কেবল তার সদস্যরাই বাঁচাতে পারে। তারা যদি ব্যর্থ হয়, তবে আইসিসি-র পতনের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়ী থাকবেন না, দায়ী থাকবে তাদের উদাসীনতা। আইসিসির প্রতি ইউরোপীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সমর্থনের প্রকাশ ভালো, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। দেশগুলো আদালতকে কেবল রক্ষা নয় বরং শক্তিশালী করতে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রথমত, আইসিসির সদস্যদের আদালতের সঙ্গে সহযোগিতা দ্বিগুণ করতে হবে। বর্তমানে তদন্তাধীন প্রতিটি পরিস্থিতির প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করতে হবে এবং তথ্য-প্রমাণ প্রদান ও আদালত কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাস্তব সহযোগিতা দিতে হবে। তারা যদি ইতোমধ্যে এটি করে থাকে, তবে তাদের এটি আবারও করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আদালতের সমর্থকদের উচিত আরও দেশকে আইসিসি-তে যোগ দিতে উৎসাহিত করা। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা এবং চাদ আদালত থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। উভয় দেশই ওয়াশিংটনের অনুরোধে এটি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি সদস্য সংখ্যা কমিয়ে আদালতের ক্ষতি করতে চায়, তবে প্রতিষ্ঠানটির সমর্থক দেশগুলোর উচিত পাল্টা প্রচারণার মাধ্যমে অন্যান্য দেশকে এতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা।
অনেক দেশ আইসিসি-তে যোগ দেওয়ার কথা ভাবলেও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এখন তাদের রাজি করানোর সময়। উদাহরণস্বরূপ, লেবানন আইসিসি-র সদস্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছে, যা ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং হিজবুল্লাহ কমান্ডারদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের বিচার করার এক্তিয়ার আদালতকে দিত।
বর্তমানে বৈরুত আদালতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে অন্যান্য দেশগুলো স্পষ্ট করতে পারে যে তারা লেবাননের যোগ দেওয়াকে সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা বলতে পারে যে আইসিসি-তে যোগ দিলে লেবানন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের পক্ষের চাপ মোকাবিলা করার জন্য আরও একটি বহুপাক্ষিক ক্ষেত্র পাবে এবং লেবাননের নাগরিকদের কাছে প্রমাণ করবে যে আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আরও আর্থিক সহায়তা দেওয়া। যদিও কেউ কেউ আইসিসির বাজেটকে বেশি মনে করেন, ২০২৬ সালে এর বাজেট প্রায় ২১০ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থ এমন একটি আদালতের জন্য ব্যয় হচ্ছে, যা ইউক্রেন, ফিলিস্তিন ও দারফুরে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে কাজ করছে। যে অর্থ যথেষ্ট নয়।
চতুর্থত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়া আইসিসি কর্মীদের দেশগুলোর উচিত যথাযথভাবে রক্ষা করা। গত বছরের আগস্টে অনেক বিচারককে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, যদিও তারা নৃশংসতার অপরাধীদের জবাবদিহি করতে কেবল নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করার কাজই করছিলেন। এর ফলে তারা ব্যাংক ব্যবহার করতে পারছেন না, হোটেল বুক করতে পারছেন না বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে খাবারের বিল পরিশোধ করতে পারছেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কানাডার আইনে এমন বিধান রয়েছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আটকাতে পারত। তবুও ব্যাখ্যাতীতভাবে ইইউ তাদের ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ প্রয়োগ করেনি এবং কানাডা তাদের ‘ফরেন এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল মেজারস অ্যাক্ট’ প্রয়োগ করতে অস্বীকার করেছে, ফলে আইসিসি-তে কর্মরত তাদের নাগরিকরা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন।
এছাড়া, ইইউ বা কানাডা কেউই মার্কিন আদালতে নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কিছু বিচারকের করা আইনি লড়াইয়ে সমর্থন দেয়নি। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রকে আইসিসি-র ওপর আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আদালতের তথাকথিত সমর্থকদের দ্বিধাগ্রস্ত থাকা উচিত নয়।
আদালতের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা পরিকল্পিতভাবে আইসিসি সমর্থকদের চুপ করিয়ে দিতে এবং তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য করা হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র জানে যে তারা একা এই আদালতকে ধ্বংস করতে পারবে না; সফল হতে হলে তাদের প্রয়োজন যেন অন্যরা আইসিসি ত্যাগ করে।
এর পরিবর্তে, দেশগুলোর উচিত এই অভূতপূর্ব সময়ে আইসিসি-কে অভূতপূর্ব উপায়ে সমর্থন করার সুযোগ নেওয়া। এটি যত ত্রুটিপূর্ণই হোক না কেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার জন্য বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধীদের জবাবদিহি করতে সক্ষম এটিই একমাত্র স্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।
ত্রুটির কারণে আদালতকে সংস্কার করা উচিত, অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য একে ধ্বংস করা উচিত নয়। ট্রাম্পের আক্রমণের মুখে আইসিসি-র প্রতি সমর্থন বজায় রাখার অর্থ কেবল আদালতকে রক্ষা করা নয় বরং এটি ঘোষণা করা যে ‘কেউ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নয়’।
.png)



