এই যুদ্ধ ইরানকে করে তুলতে পারে আরও শক্তিশালী, আরও বিপজ্জনক

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে—তিনি এমনসব পরিস্থিতি তৈরি করতে ওস্তাদ, যাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো তার ওপর আরও শক্ত চাপ সৃষ্টি করার পথ খুঁজে পায়। চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ বেইজিংকে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহিত করে। শেষ পর্যন্ত সেই দফায় শুল্কহার কমাতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।
একইভাবে, এবার ইরানও তাদের দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হুমকি বাস্তবায়ন করেছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। তেহরান বুঝে গেছে, তাদের হাতেও পশ্চিমা বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার মতো ‘অস্ত্র’ আছে।
হরমুজ প্রণালির ওপর এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ইরান এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকারই চেষ্টা করছে না, বরং এই যুদ্ধ শেষে তারা বিশ্ব রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে যেতে পারে—এমন বাস্তব সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এবারের যুদ্ধে ইরান নিশ্চিতভাবেই বড় ধাক্কা খেয়েছে। হামলার প্রথম দিনেই দেশের সর্বোচ্চ নেতা ও তার অনেক শীর্ষ উপদেষ্টা নিহত হন। তাদের জাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে, মূল্যস্ফীতিও পেরিয়ে গেছে নিয়ন্ত্রণের সীমানা। কিন্তু তা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তারা চাইলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোকে নাজেহাল করে দিতে পারে। এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় বলয়ের মার্কিন ঘনিষ্ঠ দেশুগুলোর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য বড় আয়ের সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে। গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল করার জন্য ইরান প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার করে টোল নিচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। সেই হিসেবে, ইরান যদি স্থায়ীভাবে টোল ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে প্রতি মাসে তাদের কোষাগারে বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে।
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইরান যদি জাহাজ থেকে টোল আদায় শুরু করে, তা হবে অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি হয়তো ঠিকই বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ‘অবৈধ’ টোল ঠেকানোর সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের আছে? বাস্তবতা হলো, তেহরানের বর্তমান শাসনকাঠামো পরিবর্তন করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র এখানে কিছুই করতে পারবে না।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে স্থলবাহিনী পাঠাচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের কাছ থেকে খারগ দ্বীপ দখল করে নিলেও এই সমস্যা সমাধানের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ওই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে দূর থেকে পরিচালিত ড্রোনের মাধ্যমে ইরান সেখানে এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারাও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।
এই অবস্থায় ইরানের সঙ্গে আলোচনাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে হচ্ছে। তবে ইরান এর জন্য চড়া মূল্য চাইবে—এটা অনুমান করা কঠিন নয়। তারা ভবিষ্যতের বড় আয়ের সুযোগ এবং বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দুটোই কাজে লাগাতে চাইবে। এমনকি এরই মধ্যে ইরানকে ‘প্রটেকশন মানি’ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
নিজেকে ‘আলোচনার হনু’ মনে করা ট্রাম্প এখন পড়েছেন সংকটে। তিনি নিজেই এখন স্বীকার করছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা তার কাছে অদ্ভুত মনে হয়। এমনকি তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করবেন। তবে ইরান এ ধরনের কোনো প্রস্তাবে স্পষ্টতই আগ্রহী নয়।
এদিকে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। তারা আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ শেষ হলে তেহরান উপসাগরীয় জ্বালানি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে এবং নতুন আয়ের উৎস তৈরি করবে।
এ কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারে—এমন আলোচনাও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। তবে তারা এটাও জানে, তারা যদি আসলেই যুদ্ধে নামে তাহলে ইরান তাদের জ্বালানি স্থাপনা বা পানি শোধনাগারে হামলা করবে। আর এই দুই ধরনের স্থাপনা ধ্বংস হলে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত তারা পরিস্থিতি আরও ঘোলা না করে ইরানকে অর্থ দেওয়ার রাস্তা বেছে নিতে পারে।
এমনকি এশিয়ার দেশগুলো, যারা উপসাগরীয় জ্বালানির প্রধান ক্রেতা, তারাও এই পরিস্থিতিতে ইরানকে অর্থ দেওয়ার কথা ভাবতে পারে।
জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো মার্কিন মিত্ররা জানে, ইরানকে অর্থ দিলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক এরই মধ্যে অবনতির দিকে। তাই তারাও হয়তো বেশি দামে জ্বালানি কেনা বা আবার রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বদলে এই ঝুঁকি নিতে পারে।
অবশ্যই এসব এখনও সম্ভাবনা ও আশঙ্কার পর্যায়েই আছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থলবাহিনী নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। আবার ইরানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও একসময় শাসনতন্ত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদেরকে বেশ স্থিতিশীল মনে হচ্ছে।
অনেকে হয়তো ইরানকে তার প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে দেখে খুশি হতে পারেন—বিশেষ করে যারা ট্রাম্প, ইসরায়েল বা সৌদি আরবকে অপছন্দ করেন। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি। কারণ, ইরান সরকার মধ্যপ্রাচ্যে সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে, নিজের দেশের মানুষকেও নিপীড়ন করেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করেছে।
এই যুদ্ধ শেষে যদি ইরান আরও ক্ষুব্ধ, আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে তাহলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা, বিশ্ব অর্থনীতি এবং ইরানের সাধারণ মানুষের জন্যই ক্ষতিকর হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন সেটিই সম্ভাব্য বাস্তবতা বলে মনে হচ্ছে।
লেখক : কলামিস্ট
ফিন্যান্সিয়াল রিভিউর ‘ইরান কুড ইমার্জ স্ট্রংগার অ্যান্ড মোর ডেঞ্জারাস ফ্রম দিস ওয়ার’ শীর্ষক কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।