ইরানে যুদ্ধ, উপসাগরে উত্তাপ, বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা—সবকিছুর শুরু ফিলিস্তিন সংকট থেকেই

ইরান যুদ্ধ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে। ইরান ও লেবাননে এরই মধ্যে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ফলে উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দেখে মনে হয়, এখন বোধহয় কিছুই আর কারও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই।
চারদিকে এই যে এত সংকট, সবকিছুকে একটি সহজ সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায়। আর তা হলো, এসবই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের দখলদারত্বের ফল। অন্যান্য সংঘাত যত বিস্তৃত হচ্ছে, ফিলিস্তিনের সঙ্গে এর যোগসূত্র ততই আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
এটা তো স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের বহুদিনের তথাকথিত স্থিতিশীলতা গড়ে উঠেছিল ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিসর্জনের বিনিময়ে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে অঞ্চলটির দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। তখন মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ছিল ‘ইন্টিগ্রেশন’ বা সমন্বয়—ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর অন্যান্য আরব দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাপ দেওয়া এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার নিচে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্বার্থের একটি জোট গড়ে তোলা।
ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর একই ছাতার নিচে এই অবস্থানের উদ্দেশ্য মূলত ফিলিস্তিন ইস্যুকে চাপা দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা। এ কারণেই আরব দেশগুলো মুখে ফিলিস্তিনকে সমর্থনের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে সমর্থন দেয় ইসরায়েলকে। তারা সামনাসামনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে, পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত না করার কথা বলে, কিন্তু আড়ালে চায় ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারত্ব আজীবন অব্যাহত থাকুক।
মধ্যপ্রাচ্যের কথিত এই স্থিতিশীলতা সবসময়ই ছিল আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জমি দখল করে বসতি স্থাপন করা এবং গাজায় আরও প্রায় ২০ লাখ মানুষকে অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো পরিস্থিতি যেখানে ঘটে, তাকে আর যাই বলা হোক, স্থিতিশীল বলার সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। আর এতে ফিলিস্তিনিদের মাথার ওপর দিয়ে একটি ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ইসরায়েলের ওপর সেই হামলা দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরে রক্তক্ষয়ী প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এবং বিশ্ববাসীর সামনে ইসরায়েলের বর্বরতা ও বেপরোয়া চেহারা তুলে ধরে।
আর জগতের নিয়মই হলো এই, দখলদারত্ব, বর্ণবাদী বিভাজন কিংবা ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি বর্বরতার মতো পরিস্থিতি কখনো চিরদিন বজায় রাখা যায় না। কেননা, এটা যে শুধু মানবিক মর্যাদা ও নৈতিকতা বিবর্জিত তাই নয়, বরং বাস্তবতার নিরীখেও এটি আত্মঘাতি ও মূর্খতা। এ কারণেই ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে সংঘাতের যে বৃত্ত, তা ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে শুরু করেছে।
৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল আরও বেপরোয়া হয়ে যায়। তারা ঘোষণা করে, শুধু গাজায় হামাস নয়, যাদের তারা হামাসের মিত্র বা প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি মনে করে, তাদের সবাইকে দমন করাও ইসরায়েলের লক্ষ্য। এ কারণেই তারা লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার মতোই সেখানে ভূমি দখল ও হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়।
এই দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানে হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তার সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করছে। অর্থাৎ যেসব শক্তি তাদের প্রতিপক্ষকে সমর্থন করে, সেই রাষ্ট্রগুলোর সরকার পরিবর্তনও তাদের লক্ষ্য। অথচ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে প্রায় সবকিছুই পেয়ে গেছেন, যা তিনি চেয়েছিলেন—গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে। তাছাড়া তিনি নিজেও এখনও দুর্নীতির মামলায় বিচার কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হননি।
এভাবেই ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তার অজুহাতে পুরো অঞ্চলকে নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, এমনকি বিশ্বের গতিপথও নির্ধারণের চেষ্টা করছে তারা।
কেন ইরানে মার্কিন হামলায় শিশু মারা যাচ্ছে, কেন উপসাগরীয় দেশগুলো এমন সংকটে পড়েছে, কেনই বা এখন গাড়িতে তেল ভরতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে: ফিলিস্তিন ইস্যুকে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টাই আজকের এসব ঘটনার জন্য দায়ী। এমনকি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্রদের আটক হওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে।
অবশ্য পরিস্থিতিকে উসকে দিয়েছে আরও কিছু বিষয়—যেমন ট্রাম্প প্রশাসনের চরমপন্থি নীতি বা নেতানিয়াহু সরকারেরও একই ধরনের অবস্থান। কিন্তু যে বাস্তবতা বিশ্বকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, তা আগেই সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ যখন ভাবা হচ্ছিল যে, ফিলিস্তিন সমস্যা আপাতত সরিয়ে রাখা যেতে পারে এবং বাণিজ্য চুক্তি, অস্ত্র বিক্রি ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার মাধ্যমে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোকে নিয়ে একটি স্থিতিশীল অঞ্চল তৈরি করা সম্ভব, তখনই এই সংকটের বীজ বপন করা হয়।
এ ধারণার আসারতা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। কারণ কয়েক সপ্তাহের ইরান যুদ্ধে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো এই তথাকথিত অংশীদার ও মিত্র দেশগুলো, যারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল, তাদের কখনোই ‘প্রকৃত অংশীদার’ মনে করা হয়নি, বরং অধস্তন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এমন রাষ্ট্র, যাদের কাছ থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের খরচ মেটানোর জন্য শুধু অর্থ নেওয়ার কথাই চিন্তা করা হয়, এর বেশি কিছু নয়।
শুধু তাই নয়, ইদানীং তাদের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং তা না করলে ‘পরিণতির’ হুঁশিয়ারিও দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক্সে লিখেছেন, ‘আশা করি, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো এ যুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। কারণ এই যুদ্ধ তাদের অঞ্চলেই চলছে। তা না হলে এর পরিণতিও তাদের ভুগতে হবে।’
যেসব দেশ তাদের অর্থনীতি ও আকাশসীমা যুদ্ধের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং নিজেদের ভূমি ও সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের অপমান। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব শেষ পর্যন্ত একমুখী বলেই প্রমাণিত হলো, যার সুফল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নীতিগত লক্ষ্যেই কাজে লাগে।
এই অসম সম্পর্ক নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এই অসন্তোষ অর্থবহ হয়ে উঠবে তখনই, যখন তারা মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকার কৌশলটি পুনর্বিবেচনা করবে, যেখানে তারা নিজেরা আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তোলার বদলে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে।
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের লাখো আরব জনগণের প্রতি হওয়া বর্বরতা মেনে নেওয়া মানে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রতি হওয়ার বর্বরতাকেই মেনে নেওয়া। আর যদি কেউ বিশ্বাস করে, ইসরায়েল সেই দমননীতি কোনো সংঘাত, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি বা সামরিক আধিপত্য ছাড়া পরিচালনা করতে পারবে, তবে সে ভুলের মধ্যে আছে। শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব সবার ওপরই পড়বে।
আমি যখন বলি, এই সব পথ শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনে গিয়েই মিলেছে, তখন এটা আমি শুধু আলঙ্কারিক অর্থে বলছি না। আমি এই কথা বলে বোঝাতে চাই, বৈশ্বিক এই ধাক্কাগুলো সামলানোর একমাত্র পথও ফিলিস্তিনেই আছে। ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তি নিশ্চিত করতে না পারাই মধ্যপ্রাচ্যের সব সংকটের উৎস—‘আদি পাপ’।
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেখার চেয়ে অন্তহীন যুদ্ধই নেতানিয়াহু বেশি পছন্দ করেন। তার সরকারই ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্য এবং পুরো বিশ্বকে এই বিস্তৃত সংকটে জড়িয়ে ফেলেছে।
ধরা যাক, এই সংঘাতে হিজবুল্লাহর শেষ সদস্যটিও নিহত হলো এবং ইরানের সরকারও পতন হলো। তবুও আরব অঞ্চল ও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে ফিলিস্তিন একটি জীবন্ত ইস্যু। এটিকে ভুলে যাওয়া কিংবা গণহত্যা ও দখলদারত্ব যে মানুষের ক্ষোভকে উসকে দেয়, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা মানে অতীতে বিশ্বশক্তিগুলো যে ভুল করেছিল, আবারও সেই একই ভুল করা। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিলিস্তিনকে কোনো কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, বরং একে স্বাধীন করে দিতে হবে। যতদিন পর্যন্ত সেটি না করা যাবে, ততদিন পর্যন্ত এই সংকটের মূল্য সবাইকেই দিতে হবে।
লেখক: গার্ডিয়ানের কলামিস্ট
গার্ডিয়ানের মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত।