বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে নতুন বাস্তবতা: আস্থার সংকট পেরিয়ে বদলে যাচ্ছে গ্রাহকের পছন্দ

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন, তারল্য সংকট ও অনিয়মের নানা অভিযোগ ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে। আতঙ্কিত আমানতকারীদের অনেকে অর্থ তুলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রচলিত ব্যাংকে স্থানান্তর করেন।
তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংকিং থেকে সরে যাচ্ছেন না; বরং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা খুঁজছেন। প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোতে আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। অর্থাৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সেই চাহিদার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আমানতের নিরাপত্তা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার প্রত্যাশা।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে আমানত কমছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের অধিকাংশ সময় প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার আশপাশে থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা প্রায় ৩.৯ লাখ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১.০৭ শতাংশে।
অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোতে আমানত দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে যেখানে এসব সেবায় আমানত ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে—দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী অস্থিতিশীলতার কারণে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার বিবেচনায় অনেকে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডোর দিকে ঝুঁকেছেন।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি অনাগ্রহ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি আস্থার নতুন সমীকরণ—ব্যাংকটি ইসলামী কি না, তার পাশাপাশি এখন গ্রাহক জানতে চান প্রতিষ্ঠানটি কতটা সুশাসিত, স্বচ্ছ, নিরাপদ ও দক্ষ।
চার দশকের অর্জন ও কিছু কাঠামোগত ঝুঁকি
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। চার দশকের বেশি সময়ে একাধিক ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রায় আড়াই গুণ এবং বিনিয়োগ প্রায় চার গুণ হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি একদিকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তার প্রমাণ, অন্যদিকে আমানতের তুলনায় দ্রুত বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের গুণগত মানের বিষয়ে সতর্ক হওয়ারও কারণ।
কারণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন কেবল সুদ পরিহার নয়। এর সঙ্গে জড়িত ন্যায়, স্বচ্ছতা, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, মুনাফা ও ঝুঁকির ন্যায্য বণ্টন, শরিয়াহসম্মত ব্যবসা এবং সামাজিক কল্যাণ। মুদারাবা ও মুশারাকার মতো অংশীদারিত্বভিত্তিক ব্যবস্থা এবং মুরাবাহার মতো সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন এই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুতরাং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সাফল্য শুধু ‘সুদমুক্ত’ কাঠামোয় নয়; বরং শরিয়াহর নৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই মূল বিবেচ্য।
আস্থার সংকটের শিক্ষা
গত এক দশকে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে মালিকানা ও পরিচালনাগত প্রভাব, বড় অঙ্কের অনিয়ম, ঋণ ও বিনিয়োগের গুণগত দুর্বলতা এবং বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২২ সালে এসব ঘটনার পর কয়েকটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে।
ফলে স্পষ্ট হয়েছে যে, ব্যাংকিং সংকট কখনোই শুধু তারল্য সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িত বিনিয়োগের গুণগত মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং সর্বোপরি আস্থা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা
এই প্রেক্ষাপটে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক—একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রের অবদান ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের অবদান ১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে একীভূতকরণই চূড়ান্ত সমাধান নয়। খেলাপি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, অনিয়মের তদন্ত, সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন, প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত একীভূতকরণ এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে খেলাপি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে বিপুলসংখ্যক মামলা, এক্সিট পলিসি ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পূর্ববর্তী সময়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি যাচাইয়ে ফরেনসিক অডিটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আমানতকারীদের জন্য মূল অর্থ উত্তোলনের সুযোগ এবং প্রাপ্য মুনাফায় কোনো ‘হেয়ারকাট’ না করার ঘোষণা আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা তখনই স্বাভাবিক হয়, যখন গ্রাহক প্রয়োজনের সময় তার অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা অনুভব করেন।
প্রচলিত ব্যাংকের জন্য নতুন বাজার
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর সংকট প্রচলিত ব্যাংকের জন্য শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে বেশ কিছু প্রচলিত ব্যাংক ইসলামী শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দিচ্ছে এবং এ সংখ্যা আরও বাড়ছে।
ফলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে এই প্রতিযোগিতা শুধু আমানত সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শরিয়াহ পরিপালন, সেবা, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক আস্থার প্রতিযোগিতায় পরিণত হওয়া প্রয়োজন।
গ্রাহক আসলে কী চান?
সাম্প্রতিক প্রবণতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকিং চান, কিন্তু দুর্বল ব্যাংক চান না। তারা শরিয়াহসম্মত সেবা চান, পাশাপাশি চান নিরাপদ আমানত; মুনাফা চান, কিন্তু চান স্বচ্ছ হিসাব; ইসলামী মূল্যবোধ চান, পাশাপাশি চান আধুনিক প্রযুক্তি ও দ্রুত সেবা।
অতএব আগামী দিনের ইসলামী ব্যাংকিংকে শুধু ‘শরিয়াহসম্মত’ হলেই হবে না; একই সঙ্গে হতে হবে সুশাসিত, স্বচ্ছ, নিরাপদ, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। সাম্প্রতিক সংকটকে তাই এর সমাপ্তি হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং এটি হতে পারে প্রয়োজনীয় পুনর্মূল্যায়ন, সংস্কার ও পুনর্গঠনের সুযোগ।
গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংকিং ছেড়ে যাচ্ছেন না; তারা খুঁজছেন বিশ্বাসযোগ্য ইসলামী ব্যাংকিং। যে প্রতিষ্ঠান আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, বিনিয়োগে শৃঙ্খলা আনবে, শক্তিশালী সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নৈতিক দর্শনকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত করবে—ভবিষ্যতের বাজারে নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকবে।কারণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় মূলধন কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নয়—গ্রাহকের আস্থা।
লেখক পরিচিতি
মো. খায়রুল হাসান, ইসলামিক ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।




