গার্ডিয়ানের কলাম/দিল্লির রাজপথ নরেন্দ্র মোদিকে যেভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে, তা আগে দেখা যায়নি

গত জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছিলেন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের সমর্থকেরা। সেই সময়ই পুরো ভারতবাসী প্রথম উপলব্ধি করে, ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম সমাজের চেপে বসা স্থবিরতার অভিশাপ এবং ভয়ের অদৃশ্য শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এত দিনের অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তিও চূর্ণ হয়ে গেছে।
ভারতের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই বিশ্বাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে পরিবর্তন আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও ধীরগতির আন্দোলন করতে হয়। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দেখিয়ে দিয়েছে যে বিপ্লবের গতিকেও বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়।
এবার ককরোচদের দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, ভোটার তালিকা থেকে বড় পরিসরে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে তার ভূমিকা ছিল। বিজেপি তখন শিক্ষামন্ত্রীকে বলি দিতে রাজি থাকায় ককরোচদের প্রথম পর্বের আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে কাউকে বলির পাঁঠা বানিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করলে মোদি সরকারকেও পদত্যাগ করতে হবে; সেটি হলে তা কার্যত ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার এক প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হয়ে দাঁড়াবে।
এখন পর্যন্ত বিজেপির প্রতিক্রিয়া ছিল চরম বেপরোয়া ও মারমুখী। পুরো শক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছিল রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী সব সংস্থা। সাংবাদিকদের আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার মারধর চালানো হয়েছে এবং রাজধানীতে ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্বের আন্দোলনে ককরোচদের নেতা অভিজিৎ দিপকের ঘোষিত কর্মসূচি অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় আন্দোলনের তিন নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত কর্মসূচি প্রচার করা ছিল কৌশলগত চিন্তা ও সাংগঠনিক দূরদর্শিতার অভাবের শামিল। ফলে আন্দোলনের দিন সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তাঁদের আটক করে। নেতাদের অভিযোগ, তাদের কয়েক হাজার কর্মীকে আগেই আটক করা হয়েছে অথবা রাজধানীতে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।
ফলে গত ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। সেদিন শুধু বামপন্থী ও কংগ্রেস-সমর্থিত ছাত্রসংগঠন, পরিচিত ও সাহসী তরুণ কর্মী (নেহা বোরা, ঐশী ঘোষ, গুরমেহর কৌর) এবং তাদের নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাই রাজপথে অবস্থান ধরে রেখেছিলেন এবং পুলিশের বর্বরোচিত দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
রাজপথে ককরোচদের নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল এবং তা ১২ অক্টোবর চূড়ান্ত রূপ নেয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া রাহুল গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দিল্লির রাজপথ সাধারণ মানুষের এমন এক অবিস্মরণীয় প্রতিরোধে ভরে ওঠে, যা আমি আমার জীবনে কখনো দেখিনি। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রও হয়তো আগে থেকেই বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিল। দিল্লির পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৯০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল, শহরের কেন্দ্রস্থলের ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং দিল্লিতে যাওয়ার বিভিন্ন ট্রেন বাতিল করা হয়। এমনকি রাজধানীতে আসতে থাকা ছাত্রকর্মীদের ট্রেনের বগি থেকেই তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
পরদিন যন্তর মন্তরে প্রবেশের সময় ককরোচ আন্দোলনের একটি ছোট দল গ্রেপ্তার হয়; কারণ দিল্লি পুলিশ আগেই ওই স্থানটিকে বিক্ষোভের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয় এবং পরে তাদের পাঁচ দিনের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশের এমন কঠোর দমননীতির পরও সাধারণ মানুষ রাজপথের এই লড়াই চালিয়ে যেতে উন্মুখ। সামাজিক মাধ্যমের প্রতিটি স্ক্রিনগ্র্যাব, ভিডিও আর রিল সাক্ষ্য দিচ্ছে যে আমরা একটি আন্দোলনকে উৎসবে রূপ নেওয়ার এক অভাবনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছি। গান, স্লোগান, হঠাৎ নেচে ওঠা, ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড আর মানুষের অকৃত্রিম আনন্দ, এ যেন তাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিনের সেই ‘কার্নিভালেস্ক’ বা উৎসবমুখী প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। এই উদযাপনের কারণ কী? কারণ একটাই, রাষ্ট্র যে পিছু হটছে, তা স্পষ্ট। মানুষ এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যঙ্গ ও উপহাস করার সাহস দেখাচ্ছে।
আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগানগুলোর একটি ছিল, ‘যব যব মোদি ডরতা হ্যায়, পুলিশ কো আগে করতা হ্যায়’ (যখনই মোদি ভয় পায়, তখনই পুলিশকে সামনে এগিয়ে দেয়)। সরকারের চরম ভীতি সবচেয়ে নগ্নভাবে ধরা পড়েছিল ১৬ অক্টোবর মধ্য দিল্লির কনট প্লেসে। সেদিন সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে উদযাপনের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি। সেই ডাকে শঙ্কিত হয়ে নিউদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল পার্কটি দুই দিনের জন্য বন্ধ করে দেয় এবং চারদিকে দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড গড়ে তোলে। পার্কটি পুরোপুরি ঘিরে ফেলা হয়, নিরাপত্তা সদস্যরা ধাতব রেলিং বরাবর মানবপ্রাচীর তৈরি করেন এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ২২০টি কোম্পানি মোতায়েন করা হয়।
কনট প্লেসের দিকে যাওয়ার সময় ককরোচ আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দিপক এবং কমিউনিস্ট ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকে আটক করা হয়। গভীর রাত পর্যন্ত কাউকেই আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যার ফলে তাদের অবস্থান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। পরের দিন সকালে নেহা বোরা ছাড়া পান এবং শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্ত হন দিপক।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকার শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতালম্বীদের ওপর ‘দেশবিরোধী’ তকমা সেঁটে দিয়ে এবং বিতর্কিত বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের (ইউএপিএ) আওতায় ফেলে নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। ককরোচদের আন্দোলনের মূল বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে ছিল একটি অত্যন্ত সহজ বিষয়ের ভেতর; নাগরিকদের হাতে থাকা ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোকে রাষ্ট্র কীভাবে ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে দেখাবে? বর্তমানে দেশটিতে এমন এক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, যারা নিজেদের বৈধতা নিয়েই দ্বিধান্বিত। আর তাই সাধারণ নাগরিকদের হাতে থাকা দেশের জাতীয় পতাকাকেও তারা এখন বড় অস্ত্র বলে মনে করে।
অনলাইন জগতের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মরিয়া চেষ্টার মধ্য দিয়েও সরকারের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। এ জন্য গ্রীষ্মকালে মেটার কর্মকর্তাদের তলব করা হয়েছিল এবং চলতি মাসের শুরুতে ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। যে দলটি হোয়াটসঅ্যাপের অপপ্রচার, এক্সে (সাবেক টুইটার) নিজেদের অবিসংবাদিত নিয়ন্ত্রণ এবং বেতনভুক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে ক্ষমতায় টিকে ছিল, তাদের সেই অ্যালগরিদম (বা তার ধনিক মালিকেরা) হয়তো এখন উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্রেফ ভয়ভীতি প্রদর্শন আর অর্থের জোর দিয়ে পুরো সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমকে আজীবন নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব।
সরকারের জন্য এটি মূলত এক হারতে থাকা লড়াই, যার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে ভিজ্যুয়ালের এক নতুন ব্যাকরণ, যা বিশ্বজুড়ে নানা আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠেছে। ইউনিফর্ম পরা পুলিশের চোখে চোখ রেখে তরুণীদের নির্ভীক লড়াই কিংবা বিরোধীদলীয় এক নেতার ব্যারিকেডের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর মতো শক্তিশালী দৃশ্য আর কিছু হতে পারে না। জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো রাজনীতিকে নন্দনতাত্ত্বিক রূপ দেওয়া। আজকের দিল্লির দিকে তাকালে তিনি হয়তো খুশি হয়েই জানাতেন যে সেই নন্দনতত্ত্বকে সাধারণ জনগণও আবার নিজেদের দখলে ছিনিয়ে নিতে পারে।
১২ অক্টোবরের বিশাল জমায়েতের পর রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটি তাণ্ডব, স্বয়ং দেবাদিদেব শিবের তাণ্ডবনৃত্য। এর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি শিবের বিয়ের শোভাযাত্রা, যে কেউ এতে যুক্ত হতে পারে।’ শিবের এই রূপক ব্যবহার ছিল একটি হিসাবি রাজনৈতিক চাল। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের অনুভূতিকে স্পর্শ করতেই এই বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যাদের কাছে বারবার এই মিথ্যা বিশ্বাস বিক্রি করা হয়েছিল যে কেবল মোদিই তাদের একমাত্র রক্ষক।
সম্প্রতি তরুণ ‘জেন-জি’ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরির এক মরিয়া চেষ্টায় নরেন্দ্র মোদিকে রিমিঙ ভজনধর্মী পার্টিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি হয়তো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার ধাক্কা অনুভব করবেন। কারণ ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ভোট এনে দেওয়া মোদির সেই কট্টর সমর্থকগোষ্ঠীও বুঝতে পারছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি। আর আজ তাদের নিজেদের সন্তানেরাই রাষ্ট্রের সেই নৃশংস দমন-পীড়নের প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে।
উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিষাক্ত থাবা থেকে হিন্দুদের বের করে না আনলে ভারতকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এই আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এই অপ্রত্যাশিত সত্যটিই উন্মোচিত হয়েছে। এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে পারুক বা না পারুক, এটি প্রমাণ করে দিয়েছে যে বিজেপির মতো বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষকে এক ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব।
লেখক পরিচিতি:
মীনা কান্দাসামি একজন ভারতীয় কবি, ঔপন্যাসিক ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি ভারতের চেন্নাইয়ে বসবাস করেন।
