নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে দৌলতদিয়ায় নিহত শিশুদের খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাদের সালাম গ্রহণ করবেন। আমরা এখন অনেক দূরে, মেঘের ওপারে এক শান্ত স্বর্গে বসে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। এখানে কোনো বাসের বিকট হর্ন নেই, পিচঢালা কালো পথে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ নেই, বাসসহ পানি ডুবে দম বন্ধ হওয়ার ভয় নেই। আর নেই কোনো যন্ত্রণা বা বাবা-মায়ের আর্তনাদ।
আমরা আটজন কথা বলছি। গতকাল দৌলতদিয়ায় যে ভয়ংকর বাস দুর্ঘটনাটি ঘটল, আমরা সেই আটটি হতভাগ্য শিশু। বিশ্বাস করুন, আমাদের মন পড়ে আছে আমাদের বাবা-মায়ের কাছে। আমাদের মায়ের বুকফাটা কান্না আমরা এখান থেকেও শুনতে পাচ্ছি। আপনি কি কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
গতকাল বাসে বসে আমরা কেউ মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম, কেউবা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম গাছপালার ছুটে চলা। আমাদের চোখে ছিল আগামীর কত স্বপ্ন! কেউ হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার, কেউ শিক্ষক, কেউবা আপনার মতো বড় মানুষ। কিন্তু হঠাৎ একটা বিকট শব্দ, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর মায়ের সেই শেষ আর্তনাদ—মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। পানির চাপে যখন আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমাদের খেলনা, আমাদের রঙিন স্কুলব্যাগ আর আমাদের স্বপ্নগুলো ওই দৌলতদিয়ায় মাছ আর নানা প্রাণীর বাসা হয়ে রইল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা তো ছোট, কিন্তু ওপর থেকে আমরা এখন সব দেখতে পাই। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের এই মৃত্যুর জন্য শুধু একটা ধাতব বাস বা একটা দুর্ঘটনা দায়ী নয়; দায়ী একটা বিশাল ও ভয়ংকর সিন্ডিকেট। আমরা জানতাম না যে, যে চালকের হাতে আমাদের জীবনের ভার ছিল, সে হয়তো গাড়ি চালানোর কোনো পরীক্ষাই দেয়নি। হয়তো ঘুষের বিনিময়ে কেনা একটা ভুয়া লাইসেন্স পকেটে নিয়ে সে রাস্তায় নেমেছিল আমাদের মৃত্যুর দূত হয়ে।
আমরা অবাক হয়ে দেখি, পরিবহন খাতের এই সিন্ডিকেটের কাছে আমাদের জীবনের কোনো মূল্যই নেই! অনেক চালক মাদক নিয়ে স্টিয়ারিং ধরে। নেশার ঘোরে তাদের চোখ লাল থাকে, কিন্তু তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি ছোটায়। তারা কোনো আইন মানে না, সড়ক আইন কী—তাও তারা জানে না। এই চরম অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর অবহেলার কারণেই তো আমাদের মতো হাজারো স্বপ্ন প্রতিদিন পিষে যাচ্ছে ঘাতক বাসের চাকায়।
আমাদের তো বিদায় হয়েছে, আমরা আর কোনোদিন মায়ের বুকে ফিরে যাব না। আর কোনোদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে খেলনার বায়না করব না। কিন্তু বাংলাদেশে তো আমাদের মতো আরও লাখ লাখ শিশু আছে। আমাদের বন্ধুরা যেন নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, ওরা যেন মায়ের হাত ধরে নিশ্চিন্তে রাস্তায় হাঁটতে পারে—এটুকুই আমাদের চাওয়া।
আমাদের বিনীত অনুরোধ, আপনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। দেশের অনেক সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব এখন আপনার কাঁধে। আমাদের অনুরোধ, আপনি এই ঘাতক সিন্ডিকেট ভেঙে দিন। চালকদের পরীক্ষা ছাড়া, ঘুষের বিনিময়ে লাইসেন্স দেওয়া চিরতরে বন্ধ করুন। প্রতিটি চালকের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করুন এবং সড়কে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করুন। এই অব্যবস্থাপনাগুলোর সংস্কার করে আমাদের বন্ধুদের জন্য সড়কগুলোকে নিরাপদ করে দিন।
আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি হোক। আর কোনো ছোট শিশুর রক্তে যেন রাজপথ লাল না হয়। আমাদের এই ছোট্ট চিঠিটা কি আপনার কাছে পৌঁছাবে? আমাদের জন্য না হোক, বেঁচে থাকা আমাদের বন্ধুদের জন্য আপনি সড়কগুলো নিরাপদ করে দিন। আমরা স্বর্গ থেকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকব।
ইতি,
গতকাল দৌলতদিয়ার সড়কে হারিয়ে যাওয়া আপনার আটটি ছোট্ট সন্তান।
সতর্কতা: চিঠিটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।