ই-রিক্সার বিধিমালা বিদ্যুতের প্রশ্নে অন্ধ

রাত একটা। শহরের যেকোনো একটা গলিতে হাঁটুন। কোনো এক টিনের চালার নিচে সারি সারি রিক্সা দাঁড়িয়ে। প্রতিটার পেছনে একটা তার। তারগুলো গিয়ে মিলেছে দেয়ালের একটা বোর্ডে। বোর্ড থেকে খুঁটিতে। খুঁটি থেকে কোথায়, সেটা কেউ জানে না।
এই ছবিটা আপনি চেনেন। আমিও চিনি। সরকারও চেনে। তবু ২৯ অক্টোবরের গেজেটে ছবিটার জায়গায় বসানো হয়েছে একটা স্বপ্ন। সৌর প্যানেলের স্বপ্ন।
আমি স্বপ্নের বিরুদ্ধে নই। আমি বিরুদ্ধে সেই স্বপ্নের, যার নিচে কোনো হিসাব নেই।
আগে জানতে হবে, কত বিদ্যুৎ যাচ্ছে
একটা সোজা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। ই-রিক্সা আর ইজিবাইক কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে?
উত্তরটা সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, ব্যাটারিচালিত যানের সংখ্যা বা তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্ভুল তথ্য কোনো সরকারি সংস্থার হাতে এখন নেই। তবে অনুমান আছে, অনেকগুলো, একটার সঙ্গে আরেকটা মেলে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় পাঁচ শতাংশ, মানে প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এই তিন চাকার গাড়ি। কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) এক সমীক্ষা বলছে, ১৪ লাখ ইজিবাইক দিনে ৬৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা মোট স্থাপিত ক্ষমতার ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বুয়েটের একটি সমীক্ষার কথা বলা হয়েছে আরেকটি প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি, ১০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত যান প্রতিদিন চার্জের জন্য প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
তিনটা সংখ্যা। ৭৫০, ৬৫৯, ১০০০। তিনটাই আলাদা গবেষণা, আলাদা ধরন। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে কত ব্যবহার করে, তা কারো জানা নেই। আর যা জানা নেই, তার জন্য নীতি বানালে কী হয়?
যানের সংখ্যাতেও একই কাণ্ড। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। সিপিডির হিসাবে প্রায় ৬০ লাখ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা বলেছিলেন প্রায় ৪০ লাখ, তার মধ্যে ঢাকাতেই ১২ লাখের বেশি। বুয়েটের এক অধ্যাপক বলেছিলেন, ছয় লাখ না ষাট লাখ, এই তর্ক বন্ধ করুন। দশগুণ তফাত। এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একটা দেশ নীতি লিখছে।
বিধিমালা কী বলছে
এবার দেখি গেজেট কী বলছে। বিধি ১১ হলো চার্জিংয়ের বিধি।
কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত লাইসেন্সধারী চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ দিতে হবে। সেই পয়েন্টগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিধি ১১(৫) আরও খুলে বলেছে, নেট মিটারিং ব্যবস্থায় সৌর প্যানেল বসাতে হবে। দিনের বেলায় সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে।
নেট মিটারিং কাগজে-কলমে কিলোওয়াট-ঘণ্টার হিসাব মেলায়। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সমস্যাটা তো শুধু কিলোওয়াট-ঘণ্টার নয়, সময়েরও। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিক আওয়ার শেষ হলে মধ্যরাতের পর চাহিদা এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কমার কথা। কিন্তু কমছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী পিক আওয়ার সরে গেছে মধ্যরাতের দিকে, আর সব মিলিয়ে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি উঠছে। এই হলো সমস্যার গোড়া। আর বিধি ১১(৫) সেই গোড়াতেই লিখে দিল, রাতে গ্রিড থেকে চার্জ দেওয়া যাবে।
আমি বলছি না, এটা ইচ্ছা করে করা। আমি বলছি, ধারাটা যিনি লিখেছেন, তিনি সম্ভবত গ্রিডের লোড কার্ভ দেখেননি। অথবা দেখেছেন, কিন্তু হিসাব করে লেখেননি।
প্যানেল বসবে কোথায়, কত টাকায়, কার টাকায়?
ঢাকায় চার্জিং স্টেশন আছে প্রায় পাঁচ হাজার, এমন একটা অনুমান আরেকটি প্রতিবেদনে এসেছে। এর অনেকগুলো চলছে অবৈধ সংযোগে। ধরে নিন, এর অর্ধেকও বৈধ হতে চাইল। প্রত্যেককে সৌর প্যানেল বসাতে হবে। কোথায়? টিনের চালায়? তিন তলার ছাদে ভাড়া নেওয়া একটা ঘরে? দুই কাঠা জমির ওপর যে ঝুপড়ি গ্যারেজ?
বিধি ১১(৬) বলছে, চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য সরকারি অনুমোদন লাগবে। ভালো কথা। কিন্তু কোন কর্তৃপক্ষ দেবে? কত দিনে? কত ফিতে? বিধিমালা বলে না। ফি-র তফসিলে আছে শুধু নিবন্ধন, নবায়ন আর ফিটনেসের ফি। চার্জিং পয়েন্টের লাইসেন্সের ফি নেই। সংজ্ঞায় ‘লাইসেন্স’ বলতে ধরা হয়েছে উৎপাদন লাইসেন্স বা চার্জিং পয়েন্ট লাইসেন্স। অথচ এই লাইসেন্সের শর্ত বা খরচের কোনো তালিকা বিধিমালায় পাওয়া যায়নি।
বিধি ১১(৩) আবার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চার্জিং স্টেশন আর ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র বানানোর উদ্যোগের কথা বলছে। কতগুলো? কোথায়? কবে? অর্থ আসবে কোথা থেকে? একটা শব্দও নেই। ‘গ্রহণ করিবে’। ব্যস।
এক প্রতিমন্ত্রী আগস্টে বলেছিলেন, সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া চার্জ দিলে জরিমানা হবে, নিবন্ধন-নবায়ন হবে না। তাঁর সেই কথা শিরোনাম হয়েছিল। কিন্তু জরিমানা কত, গেজেটে নেই। বিধি ১১(৭) শুধু বলছে, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দিলে 'বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায়' দণ্ড হবে। মানে নতুন কিছু না। যা আগেও ছিল, তাই।
আর যা আগেও ছিল, তা কাজ করেনি। বিদ্যুৎ চুরি আগেও অপরাধ ছিল। ডিসেম্বর ২০২১-এ হাইকোর্ট বলেছিলেন অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিক্সা রাস্তা থেকে সরাতে। ২০১৪ সালে ঢাকা আর চট্টগ্রামে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। এবং এগুলো রাস্তায় বেড়েছেই। আইন ছিল, প্রয়োগ ছিল না। এখন নতুন আইনও সেই পুরোনো প্রয়োগের ওপরই দাঁড়িয়ে।
কমিটিতে বিদ্যুৎ বিভাগ কোথায়?
বিধি ১৬ আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে। ই-রিক্সা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ করবে একটি কমিটি। সদস্য কারা? স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, আহ্বায়ক। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। মেট্রোপলিটন পুলিশ বা জেলা পুলিশের প্রতিনিধি। বুয়েটের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক বিভাগের প্রতিনিধি। জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি। স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন উপসচিব।
সাতজনের তালিকা। এখানে বিদ্যুৎ বিভাগের কেউ নেই। বিতরণ কোম্পানির কেউ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের কেউ নেই। বিআরটিএ-র কেউ নেই। অথচ যে বিষয়ে সুপারিশ হবে, সেই ই-রিক্সার ব্যাটারি, মোটর আর চার্জ ব্যবস্থার ভেতরে বিদ্যুৎ আর পরিবেশ ঢুকে আছে গোড়া পর্যন্ত। কমিটি প্রয়োজনে যে কোনো সংখ্যক সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে, বিধি ১৭(২)। তাহলে প্রশ্ন, যাঁদের থাকা সবচেয়ে জরুরি, তাঁদের প্রথম থেকেই রাখা হলো না কেন?
পুরোনো ব্যাটারি: নিয়ম আছে, নজরদারি নেই
এবার পরিবেশের দিকে দৃষ্টি দিই। বিধি ১৩ থেকে ১৫ পর্যন্ত তিনটি ধারা আছে। একটা ধারা বলে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ মানতে হবে। একটি ধারা বলে, পুরোনো ব্যাটারি মাটিতে, জলাশয়ে বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা বা পোড়ানো যাবে না। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো একটা ফেরত নিতে হবে এবং অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কেউ ব্যাটারি ভাঙতে বা গলাতে পারবে না।
কাগজে চমৎকার। কিন্তু কে দেখবে? কোন সংস্থা? কত লোকবল? কত জরিমানা? গেজেট নীরব। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদন বলছে, প্রতিটি যানে চার-পাঁচটি ব্যাটারি লাগে। এই হিসাবে লক্ষ লক্ষ ব্যাটারি ঘুরছে শহরে। একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে, এর বড় অংশই সিসা-অ্যাসিডের। এখানে একটা প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। বিধিমালা কেন ব্যাটারির ধরন নিয়ে কিছুই বলে না? সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি চলবে, না লিথিয়াম-আয়নে যেতে হবে? বিধি ১৯-এ ‘অননুমোদিত ব্যাটারি’ ব্যবহার অপরাধ, অথচ কোনটা অনুমোদিত, গেজেটে লেখা নেই। বলা হয়েছে, বুয়েট নির্ধারণ করবে। কিন্তু সেই মান কবে প্রকাশ হবে, গেজেটে নেই।
যে বাজারটা আইন দেখছেই না
ক্লিনের সমীক্ষা আরেকটা সংখ্যা দিয়েছে, যেটা আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তাদের হিসাবে ইজিবাইক ব্যবস্থা জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৯৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকার জোগান দেয়। এর মধ্যে ব্যাটারির বাজারই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার। আর এই যান প্রায় আড়াই কোটি মানুষকে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত দেয়। সংখ্যাগুলো একটি গবেষণার দাবি। অন্য কেউ হয়তো অন্য সংখ্যা দেবে। কিন্তু দিক একটাই। বিশাল একটা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এখানে চলছে।
এই অর্থনীতির কেন্দ্রে আছে ব্যাটারি আর চার্জ। অথচ বিধিমালা এই দুটো নিয়ে যা লিখেছে, তা প্রায় সবই ইচ্ছার তালিকা। ‘উদ্যোগ গ্রহণ করিবে’, ‘ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে’, ‘উৎসাহিত করিতে হইবে’। বাজারটা ভাঙতে হলে আগে বাজারটাকে বুঝতে হয়। কারা ব্যাটারি বানায়? কারা পুরোনোগুলো কেনে? কারা গলায়? কোথায়? এই শৃঙ্খলের একটা কড়াও গেজেটে মানচিত্রে আঁকা নেই।
ফলে কী হবে? সম্ভবত দুটো বিষয় ঘটবে। বড় চার্জিং স্টেশনওয়ালারা লাইসেন্স পাবে, ছোটরা বাদ পড়বে। আর বাদ পড়াদের ব্যবসা বন্ধ হবে না, অন্ধকারে সরে যাবে। ঠিক যেমন আগের নিষেধাজ্ঞার পরও হয়েছিল।
কী করা উচিত ছিল?
আমি প্রথমে এক সত্যিকারের তথ্যভান্ডার চাইতাম। কত যান, কত চার্জিং স্টেশন, কত বিদ্যুৎ, কোন ফিডারে কত লোড। এই তথ্য ছাড়া কোনো নীতিই দাঁড়ায় না। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি আর স্থানীয় সরকার একসঙ্গে বসে এটা করতে পারত।
তারপর রাতের চার্জিংকে নিরুৎসাহিত করতাম, উৎসাহ দিতাম দিনের বেলার চার্জ আর ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্রকে। সময়ভিত্তিক শুল্ক চালু করা যেত, যাতে রাতের পিক-আওয়ারে চার্জ দেওয়া ব্যয়বহুল হয়। বিধি ১১(৫) ঠিক উল্টোটা করেছে।
তৃতীয়ত, ব্যাটারির প্রযুক্তি নিয়ে সময়সীমা বেঁধে দিতাম। কত বছরে লিথিয়ামে যেতে হবে, তার জন্য ঋণ বা ভর্তুকি কী থাকবে। চতুর্থত, ১৬ নম্বর বিধির কমিটিতে বিদ্যুৎ বিভাগ আর পরিবেশ অধিদপ্তরকে রাখতাম।
আর শেষ কথা। অবৈধ চার্জিং বন্ধ করার জন্য আগে বৈধ চার্জিংয়ের সহজ রাস্তা খুলে দিতে হবে। কারণ যেখানে বৈধ রাস্তা কঠিন, সেখানে অবৈধ রাস্তা বাড়ে। ইতিহাস তা-ই বলছে।
বিধিমালা ‘অবিলম্বে কার্যকর’। অর্থাৎ আজ থেকে চার্জিং পয়েন্টের লাইসেন্স লাগবে। কিন্তু লাইসেন্সের আবেদন কোথায়, কোন ফর্মে, কত দিনে নিষ্পত্তি, কিছুই বলা নেই। প্রায় পাঁচ হাজার স্টেশনকে একটা অস্পষ্ট দরজা দিয়ে ঢুকতে বলা হচ্ছে। যে সময়টুকু তারা পাবে, সেই সময়ে কী হবে? আগের মতোই চলবে। শুধু এবার জানা থাকবে, কে ‘অবৈধ’। আর অস্পষ্ট নিয়মের ফাঁকে হয়রানির সুযোগও বাড়ে।
শেষ কথা
রাত একটার সেই গলিতে আবার ফিরি। চালার নিচে রিক্সার সারি। তার, বোর্ড, খুঁটি। এই ছবিটা বদলাতে হলে সৌর প্যানেলের ঘোষণা যথেষ্ট না। দরকার তথ্য, দরকার সময়ভিত্তিক দাম, দরকার ব্যাটারির মান, দরকার প্রয়োগের সক্ষমতা।
বিধিমালা এর কোনোটাই দেয়নি। দিয়েছে একটা সুন্দর বাক্য, যেটা পড়তে ভালো লাগে, শুনতে আধুনিক লাগে, আর গ্রিডের হিসাবের সামনে দাঁড়ালে ভেঙে পড়ে। নীতিনির্ধারকদের বলব, স্বপ্ন দেখুন। কিন্তু আগে মিটার দেখুন।
লেখক: এম এম মুসা, গবেষক ও সাংবাদিক