সড়কমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা, বিএনপিতেও দ্বিমত

পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে টাকা তোলাকে চাঁদাবাজি মনে করেন না সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন বক্তব্য দিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছেন তিনি। তার মতে, পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহ করছে, জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে না—তাই এটিকে চাঁদা বা চাঁদাবাজি বলা ঠিক নয়।
মন্ত্রীর এমন মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির থেকে শুরু করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতারা। এমনকি বিএনপির মধ্যেও মন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে দ্বিমত দেখা গেছে। নবনির্বাচিত পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি থেকে শুরু করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সড়কমন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।
সড়কমন্ত্রী কী বলেছেন
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় করেন ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি নেতা শেখ রবিউল আলম।
মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, সড়ক পরিবহনে চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি এই চাঁদা দেখছি না। সেটা হচ্ছে—বাস মালিক সমিতি আছে, আবার শ্রমিক সমিতিগুলোও আছে, ফেডারেশন আছে। তারা তাদের কল্যাণ—এটা একটা অলিখিত বিধির মতো; কোনো কোনো সময় তাদের কল্যাণেই তারা এটা ব্যয় করে বিধায় কালেক্ট করে তাদের সম্মতিতে। চাঁদা আমি ওইটাকে বলতে চাই যে, কেউ দিতে চায় না বা আপনাকে বাধ্য করা হচ্ছে—সেটা হলো চাঁদা।
সমালোচনার ঝড়
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সড়কমন্ত্রীর এ বক্তব্য সমালোচনার জন্য লুফে নিয়েছেন রাজনীতির মাঠে বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচতরা। এমনকি টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকেও এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ফেসবুকে মন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘তাহলে কি নবগঠিত সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলো। তাহলে কীভাবে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে? ব্যাকরণ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সূচনাতেই বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে?’
ওই পোস্টে দেশের জনগণকে উদ্দেশ করে তিনি আরও লেখেন, ‘চাঁদার কালো থাবা থেকে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। এ লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি, ইনশাআল্লাহ।’
মন্ত্রী রবিউল আলমের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে ফেসবুক পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘মন্ত্রী যাকে সমঝোতা বলছেন, বাস্তবে তা চালকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি অবৈধ পদ্ধতি। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তাসনিম জারা লেখেন, ‘নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালাতে গেলে চালকদের বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীকে টাকা দিতে হয়। একেই যদি সমঝোতা বলা হয়, তাহলে একটি অনিয়মকে বৈধতার ভাষা দেওয়া হচ্ছে।’
চাঁদাবাজি নিয়ে এ বক্তব্যের সমালোচনা করে শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘পরিবহনমন্ত্রী চাঁদাবাজির যে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন তা দুর্নীতিবিরোধী ঘোষিত অবস্থানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহার ও সরকার প্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার করা হয়েছে। সেই অঙ্গীকারের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা না যেতেই চাঁদাবাজির মতো একটি অনৈতিক ও যোগসাজশমূলক অপরাধকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন অত্যন্ত হতাশাজনক।’
এদিকে সড়কমন্ত্রীর চাঁদাবাজি নিয়ে বক্তব্যকে ‘পতিত স্বৈরাচারের পদাঙ্ক অনুসরণ’ বলে আখ্যায়িত করে শুক্রবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নতুন বাংলাদেশে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া জনপ্রিয় দল বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে দেশবাসী হতাশ হয়েছে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর ভাড়া বৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি করছে এবং পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকেও বিব্রত করছে।
বিএনপিতেও দ্বিমত
সড়কমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন তার নিজ দল বিএনপির নেতারাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম তার ফেসবুকে এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘সারা বাংলাদেশে স্লিপ দিয়ে সড়কে টাকা ওঠানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই অপসংস্কৃতি বিশ্বের ৮টি দেশ ঘুরে সেসব দেশের কোথাও চোখে পড়েনি আমার কখনোই। হ্যাঁ, সেতু-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে-মহাসড়কের যেসব স্থানে টোল দেওয়া হয় সেটা ভিন্ন। তবে যাতায়াত পথে যেখানে সেখানে (সিটি করপোরেশন-পৌরসভা-ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনের নামে) স্লিপ দিয়ে টাকা ওঠানো স্পষ্ট চাঁদাবাজি। আমাদের সরকার নিশ্চয়ই এসব ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করবে।’
শুক্রবার লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নবনির্বাচিত পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, সারা দেশে সড়কে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই। আর লক্ষ্মীপুরে তো নেই-ই।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির আর কেউ গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা। তারা বলছেন, মন্ত্রীর এমন বক্তব্য সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সরকারের জন্য অস্বস্তিকর।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, মন্ত্রী হিসেবে তিনি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছেন। আমি তার বক্তব্য পুরোটা শুনিনি। তবে আপনি যেটা বলছেন, যদি তিনি সত্যিই এভাবে বলে থাকেন, নিশ্চয়ই তিনি সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।