সুবিধাভোগীরা বৈষম্যমূলক কাঠামো ফেরাতে মাঠে নেমে পড়েছে : নাহিদ ইসলাম

‘নির্বাচনে জয়ী হলে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। নিপীড়নের ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন করা হবে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে।’
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনি ভাষণে এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোটে প্রার্থী নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও আগের দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেইনসাফি বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।’
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার করা হবে জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট আওয়ামী ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে— যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে।’
নাহিদ বলেন, ‘দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়স্বজনকে আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।’
‘একই সঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে এদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করে একটি পাবলিক ট্রাস্টের মালিকানায় নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও স্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর মাধ্যমে নবগঠিত এই সংস্থাটি পরিচালনা করা হবে।’
‘আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট— ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া’, যোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আবদ্ধ ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম কার্যত ইন্ডিয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো, ফলে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। বিএসএফ শত শত বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করলেও খুনি হাসিনার সরকার চুপ করে থেকেছে।‘
কূটনীতি বিষয়ে এনসিপি নেতা বলেন, ‘জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যঘাটতি এবং কারও ওপর অতিনির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব।’
প্রবাসীদের নিয়ে তার ভাবনা নিয়ে বলেন, ‘প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পৃথিবীর সব প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। লক্ষ্য হবে, পৃথিবীর সম্ভাবনাময় সব দেশে নামমাত্র খরচে জনবল রপ্তানি করা এবং তারা যাতে কোথাও কোনোভাবে হেনস্তার শিকার না হয়, সেই সুরক্ষা দেওয়া। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য মূল্যে ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করা। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।’