logo

আ.লীগের সবচেয়ে বড় দুই অপরাধ কী, জানালেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আ.লীগের সবচেয়ে বড় দুই অপরাধ কী, জানালেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

‘আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু নেতা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। যে টাকা দেয়, তাকে পদ-পদবি দেন। এতে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে গেল। একজন মন্ত্রী হিসেবে কিংবা পরে এমপি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগও সীমিত হয়ে গেল।’—এমন অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

সম্পত্তি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বাংলা ভাষার টিভি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দেন আব্দুল মোমেন। এ সময় তিনি তৎকালীন সরকারের শেষ সময়ের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে এসব কথা বলেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল আপনার চোখে কী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলটা হলো, কিছু নেতা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। যে টাকা দেয়, তাকে পদ-পদবি দেন। আর জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে গেল। আমার সরকার সরকারি কর্মচারীর ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হলো। ওরা যা বলে তা-ই করে। একজন মন্ত্রী হিসেবে কিংবা পরবর্তীতে এমপি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগও আমাদের সীমিত হয়ে গেল।’

কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি অফিসাররা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন, একটা না একটা বাহানা দিয়ে তিনারা সহজে (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) দেন না। আর আমরা যারা রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রী মাঝেমধ্যে কোনো জায়গায় বড় বক্তৃতা দেন, আমরা দূরে চেয়ারে বসে থাকি, আর উনি সারমন (উপদেশমূলক বাণী) দেন, আমরা এক পাশে থেকে শুনি। তারপর যখন উনি বক্তৃতা শেষ করেন, তখন আমাদের রাজনীতিবিদরা ওনার সঙ্গে কথা বলার জন্য সামনে অগ্রসর হলে সেই এসএসএফের লোক ২৫ ফুট দূরে, দূর দূর করে সরায়ে দেয়। ফলে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে কিছু বলা যে, আমরা কিছু ফিল করি, এই চাঁদাবাজি, এই করাপশন, এগুলো পাবলিক কী মনে করতেছে, সেটা বলার সুযোগ আমাদের কমে গেল।’

তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বিশেষ কোভিড মহামারির পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে গিয়েছিল। আর আওয়ামী লীগ সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, সেই সঙ্গে কিছু নেতা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।’

মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না উল্লেখ করে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘সব সময় দেখা করতে পারতাম না। কোভিডের আগে যখন আমরা মন্ত্রী হলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক দিন ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পরে সব অফিসারকে বের করে দিতেন, সব ইলেক্টেড রাজনীতিবিদদের রাখতেন। তখন উনি বলতেন যে আপনাদের কোনো সমস্যা আছে কি না। তখন আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের সমস্যাগুলো বলতাম। তখন উনি উত্তর দিতেন, কাউন্টার হতো। আমরাও কাউন্টার করতাম। কিন্তু কোভিডের পরে মিটিং শেষ হওয়ার সঙ্গেই সঙ্গে উনি বের হয়ে যান। আমরা দৌড়ে গিয়ে কিছু কথা যদি বলতে পারি, সেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করি। এই একটা ডিসটেন্স (দূরত্ব) শুরু হলো। এই ডিসটেন্স পরবর্তীতে খুব ঘোচানো হয়নি।’

আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্য মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়েছে দুটি—একটি হচ্ছে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে গেছে। আরেকটি হলো, বিভিন্ন শ্রেণির নেতা চাঁদাবাজিতে মুখ্য হয়ে গেলেন।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এগুলো আমি সংসদেও তুলেছি। আমি সংসদেও প্রস্তাব দিয়েছি যে এইগুলো বন্ধ করতে হবে। কারণ মানুষ এগুলো পছন্দ করে না। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমার দলের নীতি নির্ধারক...। আমি যেমন সংসদে বলেছি যে আমার সিলেট শহরে যে এয়ারপোর্ট হবে তিন বছরে। তিন বছর পার হয়ে গেছে ১০ শতাংশও কাজ হয় নাই। এর মূল কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। এরা দেরি করলে পরে ওটার পয়সা বাড়ে, তখন পয়সা যা অধিকতর দেওয়া হয়, এর ৮০ শতাংশ খেয়ে ফেলে। সুতরাং তাদের চিহ্নিত করে, যে পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হবে, সে যদি অনটাইম প্রজেক্ট শেষ না করে, তার ডিমোশন হবে, চাকরি যাবে যদি রিজনেবল গ্রাউন্ড না থাকে। এইগুলো কয়েকটা এক্সাম্পল।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘কোটা সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের ধারণা হলো যে আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে এই কোটা রেশনালাইজ (যৌক্তিক) পরিবর্তন চায়। আমাদের অনেক সহকর্মী এই নাতিফাতি ওগুলোর জন্য কোটা রাখার পক্ষেই না। ছেলে হইছে, আচ্ছা ছেলে-মেয়ের পর্যন্ত রাখছেন ঠিক আছে, এরপরে আর কী? কিন্তু আমরা এটা পরিবর্তন চেয়েছি এবং এইটা নীতিগতভাবেও আওয়ামী লীগ এটা গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোথায় লইয়াররা কী একটা কেস ফেস করে, তারপরে আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। তখন আমাকে বলা হলো যে, আমরা যেহেতু আপিল করেছি, কোর্টে এটা রায় দেওয়ার...। আমি বললাম, কোর্টের রায় দেওয়ার কেস না, এটা তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমি তখন আমার ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, বলছিলাম আমেরিকাতে ৪০০ বছর কোর্ট এবং জাজেরা স্লেভারিকে (দাসত্ব) প্রটেক্ট (রক্ষা) করেছে কিন্তু। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে যখন আব্রাহাম লিংকন ঘোষণা দিলেন, রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত দিলেন যে স্লেভারি ইজ অ্যাবোলিশড, এইটা বাতিল হলো। এরপর কিন্তু কোর্টের কোনো জাজ কোনো কোর্ট স্লেভারিকে প্রটেক্ট করে নাই। সুতরাং ইট ওয়াজ পলিটিক্যাল ডিসিশন। উই শুড টেক পলিটিক্যাল ডিসিশন।’

বড় বড় দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা গিয়েছিল কি না, এই প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘এই কালো টাকা সাদা করা, সেসব নিয়ে আমি বলেছি, করাপশন নিয়ে, সরকারি কর্মচারীর যে ভরাডুবি করাপশন, সেটা নিয়ে বলেছি। প্রজেক্ট ডিলে করে যে করাপশন হয়, সেটা বলেছি। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে যে একটা নৈরাজ্য...ব্যাংকিংয়ে দু-একটা লোক লাভবান হচ্ছে, যারা এমন লোক, এরা ব্যবসায়ী, আমি চিনিও না ওদের। এদের প্রোটেকশন দেওয়া হয়েছে। আমি এগুলো তুলেছি, আমি তোলার পর আমাকে বলা হলো, আমরা তো করাপশনে জিরো টলারেন্স দিয়েছি। দুদককে এম্পাওয়ার (শক্তিশালী) করেছি, তারা কাজ করবে, আমি কি প্রত্যেকের কেসের পেছনে লেগে থাকব? আমি বলেছি, দু-একটার পেছনে লাগা তো উচিত।’

আত্মসমালোচনা করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকেই আমরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করি না, খালি প্রশংসা করেই শেষ। আর দোষটা বলতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেন যে আমার পিয়নেরই ৪০০ কোটি টাকা। ওনার এক পিয়ন চাঁদাবাজি করে বহু টাকার মালিক হয়ে যায়। সুতরাং অনেক দিন থাকলে যেটা হয় সেটাই। ওই যে বললাম একটা দূরত্ব বেড়েছিল। এগুলো আমাদের অপকর্ম।’

‘আপনার চোখে সবচেয়ে করাপ্টেড কে ছিল মন্ত্রিসভায়?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘কোন রাজনীতিবিদ করাপশন করতে পারে কেবল সরকারি কর্মচারীর সহযোগিতায়, একা পারে না। কারণ প্রজেক্টের টাকার ডিসবার্সমেন্ট অফিসাররা করে। তখন অফিসারের সঙ্গে একটা আঁতাত করতে হবে, অনেক নিচে নামতে হবে, তার সঙ্গে বলতে হবে যে তুমি এটাতে টাকা খাও, এর থেকে অত অংশ আমাকে দাও। সহযোগ ছাড়া আপনি খেতে পারবেন না। একা খাইতে পারবেন না।’