logo

শহীদ সন্তানের সম্মানে জামায়াতের নারী এমপি হচ্ছেন রোকেয়া বেগম

শহীদ সন্তানের সম্মানে জামায়াতের নারী এমপি হচ্ছেন রোকেয়া বেগম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাবিরের মা রোকেয়া বেগম একজন সাবেক স্কুলশিক্ষক। তার তিন সন্তানের মধ্যে জাবির ছিল সবার ছোট। স্বামী কবির হোসাইন একটি বেসরকারি মোবাইল রিটেইল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় ছয় বছর বয়সি জাবির ইব্রাহিম পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। সে উত্তরার কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে, জাবির হেলমেট পরে তার বাবার সামনে হাজির হয়। সে বলে, আমি একজন সেনা কর্মকর্তা হব। তার বাবা জিজ্ঞেস করেন, কেন? জবাবে জাবির বলে, পুলিশ আমার ভাই-বোনদের গুলি করে হত্যা করছে। আমি একজন সেনা কর্মকর্তা হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে লড়ব।

জাবিরের বাবা এশিয়া পোস্টকে জানান, আগস্টের ৫ তারিখে সন্তানদের নিয়ে লংমার্চে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রোকেয়া বেগম নিজেই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিশু জাবির শুরু থেকেই অংশ নিতে পীড়াপীড়ি করত, বারবার বলত—আম্মু আমি আন্দোলনে যাব। জাবিবের মা সিদ্ধান্ত নেন পরিবারে সবাই মিলে শিক্ষার্থীদের লংমার্চে অংশ নেবেন। কিছুক্ষণ পর জানতে পারে স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছে। রাস্তায় স্বৈরাচারী সরকার পতন ও স্বাধীনতার আনন্দে সবাই বিজয় মিছিল বের করে। মিছিল দেখতে জাবিরকে সঙ্গে নিতে চায়নি তার মা। কিন্তু শিশু জাবিরের জেদের কাছে হার মেনে অনেকটা বাধ্য হয়েই জাবিরকে নিয়ে উত্তরায় জসীমউদ্দীন সড়কে মিছিল দেখতে যান। 

তিনি বলেন, আমার ছেলে সেদিন বলেছিল, জাতির পিতা ইব্রাহিম, শেখ মুজিব কোন ঘোড়ার ডিম। এদিকে বিজয় মিছিল হচ্ছে এ খবর জানিয়ে জাবিবের মা আমাকেও ফোনে জসীমউদ্দীন সড়কে আসতে বলেন। আমিও সেখানে যাই। এক পর্যায়ে জাবিরকে নিয়ে বাসায় ফিরে যেতে চাইলে আরও কিছুক্ষণ থাকার বায়না করে সে। 

জাবিরের মা এশিয়া পোস্টকে জানান, আমি কখনই জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। শুধু জুলাইকে সম্মান জানিয়ে জামায়াত আমাকে মনোনীত করেছে।

তিনি তার সন্তানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সাড়ে ৪টার সময় ৪নং সেক্টরের বাইতুস সালাম মাদ্রাসার গেট থেকে স্বৈরাচারী সরকারের উত্তরা পূর্ব থানার পুলিশ এপিবিএন অফিসের দিক থেকে তাদের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। তখন আমরা জাবিরের হাত ধরে সামনের দিকে দৌড় দিই। দৌড়াতে গিয়ে রাস্তায় জাবির পড়ে যায়। ওর উরুতে গুলি লাগে, রক্তে প্যান্টসহ শরীর ভেসে যাচ্ছে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে কোলে করে দ্রুতই কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়। দায়িত্বরত চিকিৎসক রক্ত দিতে বলেন। রক্ত জোগাড় হলেও ক্রস ম্যাচের অভাবে চব্বিশের ৫ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে মাত্র ৬ বছর বয়সে আমার কলিজার টুকরা শাহাদাতবরণ করে। ৪নং সেক্টর-সংলগ্ন কবরস্থানে শহীদ জাবির ইব্রাহিমকে দাফন করা হয়।

এদিকে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ১৩টি আসন পাচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতের নিজস্ব অংশে ছিল ১২টি আসন। তবে জোটের শরিকদের জন্য চারটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং জাগপা—প্রতিটি দল একটি করে আসন পেয়েছে।

জামায়াত তাদের একটি নারী আসনে মনোনয়ন দিয়েছে ‘নারী অধিকার আন্দোলন’ সংগঠনের নেত্রী ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজকে। বাকি আসনগুলো দলীয় নেত্রীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ নারী আসনের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। মনোনীতদের তালিকায় রয়েছেন নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, সাবিকুন নাহার মুন্নি, নাজমুন নাহার নীলু, মাহফুজা সিদ্দিকা, সাজেদা সামাদ ও শামছুন্নাহার নাহারসহ আরও অনেকে।

জোটের শরিক এনসিপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন মনিরা শারমিন ও মাহমুদা আলম মিতু। এর মধ্যে মিতু পূর্বে ঝালকাঠী-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন এবং পরে জোটের সমঝোতার অংশ হিসেবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সেই সমঝোতার ধারাবাহিকতায় এবার তিনি নারী আসনে মনোনয়ন পেলেন।

অন্যদিকে, জাগপার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী মজলিসের সদস্য প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিমও জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন। জোটগত সমঝোতার কারণে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিনিময়ে এসব মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংসদে প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে শরিক দলগুলোকে নারী আসন বণ্টন করা হয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াতের সমর্থনে একটি আসন পেয়েছে।