গণ-অভ্যুত্থানের অবদান নিয়ে বিতর্ককারীদের কঠোর সমালোচনা এবি পার্টির

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও অর্জনের চেয়ে ব্যর্থতার আলোচনা বেশি হচ্ছে। শেখ হাসিনা পালানোর পর অবদান নিয়ে বিতর্ক তুলে যারা জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টি করেছে, ব্যর্থতার দায় সিংহভাগ দায় তাদেরই নিতে হবে।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর ডিআরইউ অডিটোরিয়ামে ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান: বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এর আয়োজন করে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্টের পর দুটি সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে বিএনপি সরকার। রাষ্ট্র সংস্কার ও মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে উভয় সরকারকেই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসের সঙ্গে তুলনামূলক মূল্যায়ন করে এবি পার্টি আরেকটি সংলাপের আয়োজন করবে। তখন দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও জনজীবনের বাস্তব চিত্র পরিসংখ্যানসহ জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শত শত আন্দোলন হলেও বর্তমান সরকারের গত পাঁচ মাসে দাবি-দাওয়া নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আন্দোলন হয়নি। শক্তি প্রয়োগ করে সমালোচনার কণ্ঠরোধের চেষ্টাকে খুবই দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তা সরকারের জন্য হিতে বিপরীত হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মঞ্জু বলেন, সমালোচনা করলেই কণ্ঠরোধ করবেন তা মেনে নেওয়া হবে না। কণ্ঠরোধ করে কখনও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা যায় না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন, সবই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন কবি ও রাষ্ট্র চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস. মুরশিদ, সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এবিএম খালিদ হাসান, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক সুলতানা রাজিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আব্দুল ওহাব মিনার।
কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চাইলে ৭২ -এর সংবিধানকে বাতিল করতে হবে। সংবিধানে একদিকে জনগণকে সব ক্ষমতার মালিক বলা হলেও অন্যদিকে সংবিধানকেই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা তার মতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করে। একাত্তর নিয়ে কোনো আপস বা নেগোসিয়েশনের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, একাত্তরের মাধ্যমেই বাঙালি জনগোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো এত বড় একটি ঘটনা ঘটবে, এমনটি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। তার মতে, হঠাৎ করেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে।
ফরহাদ মজহার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সেকুলার ও দক্ষিণপন্থি ধারার মধ্যে ঐক্যের সেতুবন্ধন তৈরি না হবে, ততক্ষণ একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে না। প্রচলিত ধারণা ও পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তাকেও তিনি ভুল বলে মন্তব্য করেন।
একটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং শেখ হাসিনার আমলের সংবিধান বহাল রেখে প্রকৃত অর্থে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়।
তার ভাষায়, সংবিধানকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। যদি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ বলা হয়, তাহলে একই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপির সরকারকেও অবৈধ বলতে হবে।
শারমিন এস. মুরশিদ বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় চেতনাকেই ধারণ করে সামনে এগোতে হবে। তিনি বলেন, একটি সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার বিষয়। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; ২০১৮ সালের পর থেকে ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল এটি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সংস্কার উদ্যোগ রাজনৈতিক অসহযোগিতার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকার আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষকে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন করেছে।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই ব্যর্থ হয়েছেএ ধরনের বক্তব্য একটি পরিকল্পিত বয়ানের অংশ। মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড় করানো পরাজিত শক্তির প্রচারণা।
তিনি বলেন, অবদান নিয়ে প্রতিযোগিতা করা স্বার্থপরতা ও রাজনৈতিক অভদ্রতা। জুলাইয়ের মাধ্যমে জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর নানা অপপ্রচারের অবসান ঘটেছে। কোনো বিপ্লবই শতভাগ অর্জন বাস্তবায়ন করতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম সাফল্য ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন। তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এখনও অসম্পূর্ণ।
তিনি বলেন, ১৯৭১-এর আকাঙ্ক্ষা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৪-এর আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ নয়, এটি এখনও চলমান একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
সংলাপে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, পাঠাগার ও গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন রমিজ, গাজীপুর মহানগরের সদস্য সচিব মাসুদ জমাদ্দার রানা, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর শিলা, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান, যুগ্ম সদস্য সচিব, মিজানুর রহমান মিঠু, আবু তাহের খন্দকার রাশিদা আক্তার মিতু, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক সুলতান আরিফ, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী ও নারী নেত্রী ফেরদৌস আরা অপি প্রমুখ।
.png)

