পরিবর্তনের প্রতীক, নাকি পুরোনো ধারায় ফিরবেন তারেক?

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে গেলে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তারপর গত বছর আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরবর্তী শাসক দল হিসেবে এগিয়ে আছে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী, যারা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করেছে।
প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। তার মা ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি দলটির নেতৃত্বে আসেন। এবারের নির্বাচনি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। তার সমাবেশগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম হয়। গ্রেপ্তার, দলের ভেতর গ্রুপিং ও ভোটারদের থেকে দূরত্ব—এত সংকটের মধ্যেও দীর্ঘদিন পর তার উপস্থিতি দলীয় নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে।
তার প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী গুরুত্বও ছিল ব্যাপক। সামনে থেকে দলের নেতৃত্ব দেওয়া এবং সরাসরি মানুষের কাছাকাছি থাকা—এটি জনগণকে তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হলে তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর মূলত বিএনপি গড়ে ওঠে।
তবে এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। ফলে নির্বাচনি প্রচারণা যেমন প্রত্যাশায় ভরা, তেমনি সন্দেহেও আচ্ছন্ন।
নির্বাসন থেকে নেতৃত্ব
তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর লন্ডন থেকে কার্যত বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তার মা খালেদা জিয়া দেশে মামলা ও কারাবন্দি হয়ে পড়েন। আর শীর্ষ নেতৃত্বও হামলা মামলায় অনেকটা আড়ালে চলে যান। তবে, দেশে ফেরার পর তিনি মানুষের কাছাকাছি এলেও নেতৃত্বকে কার্যকর রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দলের ভেতরে শৃঙ্খলা রক্ষা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ৭৯টিতে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান আলজাজিরাকে বলেন, এবার বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নথিভুক্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ ঘটনায় বিএনপিকর্মীরা জড়িত ছিলেন। যা দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, এটি বড় দুর্বলতা। তিনি এখনো দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের মতো নেতাদের ছাপিয়ে যাওয়া সহজ নয়। আমি মনে করি না, তারেক রহমান এখনো সেই মাত্রার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দেখাতে সক্ষম হয়েছেন।
অধ্যাপক হাসানুজ্জামান নির্বাচনে তারেক রহমানের পারিবারিক উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভরতাকে একটি সুবিধা হিসেবে দেখলেও দিলারা চৌধুরী মনে করেন, এটি অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও চাপ তৈরি করবে।
দিলারা চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষা এই নির্বাচন। তিনি এখনও সেই ধরনের ক্যারিশমা দেখাতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না।
প্রস্তুতি কম
তারেক রহমানের বক্তৃতা নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি ও তথ্যগত ভুল বক্তব্য অনিশ্চিত ভোটারদের আস্থা আরও কমাতে পারে। তার বিভিন্ন বক্তব্যের ফ্যাক্ট-চেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফরিদপুরে এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, এই জেলায় বিপুল পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদিত হয়, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়। আরেক ঘটনায় তার কিছু প্রতিশ্রুতি ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়কার পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি বলে সমালোচিত হয়।
এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হ্যাঁ, বক্তৃতায় ভুল হয়। তবে তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি উন্নতি করবেন।’
দিলারা চৌধুরী বলেন, তারেক রহমান প্রচারণার দায়িত্ব নিয়েছেন; কিন্তু সে তুলনায় তার প্রস্তুতি কম। তিনি অনেক কথা বলেছেন যা ভুল, যেমন তিনি ৫০ কোটি গাছ লাগানোর মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তারেক রহমানের প্রধান প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দিলারা চৌধুরী।
তিনি বলেন, আপনি যখন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে কথা বলবেন তখন প্রথমেই যে প্রশ্ন উঠবে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে। আর অনির্দিষ্টকালের জন্য বেকার ভাতা দিলে অর্থনীতি কম উৎপাদনশীল হয়ে পড়তে পারে।
দিলারা চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যও জনগণের মধ্যে পুরোপুরি আস্থা তৈরি করতে পারেনি। তিনি দুর্নীতি নির্মূলের কথা বলছেন, অথচ ২৩ জন ঋণখেলাপিকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছেন।
গত সোমবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে তারেক অতীতের ভুল স্বীকার করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার বিকল্প নেই। বিএনপি ক্ষমতা যেতে পারলে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারে যথাসম্ভব দৃঢ় থাকবে—এটাই জাতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক খান সোবায়েল বিন রফিক বলেন, ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী অনেক ভোটার বিএনপির শাসন দেখেননি। অনেক তরুণ বিএনপিকে দুর্নীতি ও ‘চাঁদাবাজি’র সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন। দল হিসেবে বিএনপি এখনও সেই ধারণা বদলাতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পরামর্শদাতা থমাস কিন মনে করেন, হাসিনার সময়কার দমননীতিতে আবারও ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি সম্পর্কে জনগণের ধারণা প্রভাবিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান নেতৃত্ব হয়তো বুঝতে পেরেছে যে, বাংলাদেশে মৌলিকভাবে কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক না কেন, তরুণ ভোটারদের কাছে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ণ হচ্ছে।
আনুগত্য বনাম যোগ্যতা
গত শুক্রবার ঢাকায় নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণায় তারেক বলেন, সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষকে বসাতে হবে; কিন্তু বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রের মতে, তার নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে সেই নীতি কতটা মানা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আলজাজিরাকে এক বিএনপি নেতা বলেন, তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে এসেছেন। দেশে ১৭ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। তারা বাস্তবতা পুরোপুরি ধরতে পারছেন না।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূলের সরাসরি যোগাযোগ ধরনও বদলে গেছে।
আলজাজিরাকে দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানিয়েছে, তারেক রহমানের সঙ্গে জনগণের সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যার ফলে দেশজুড়ে তার ব্যাপক ভ্রমণ সত্ত্বেও তৃণমূলের সরাসরি প্রতিক্রিয়া তিনি খুব বেশি জানেন না। তিনি বাস্তবতা থেকে দূরে আছেন। তারেক রহমান যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বেছে নিয়েছেন।
দলের একটি অংশ মনে করেন, অনুগত লোকদের দিয়ে দল চালাতে পারলেও সরকার চালানো সম্ভব নয়। এটাই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি তিনি শাসন করতে চান, তাহলে তাকে যোগ্যতার প্রসার ঘটাতে হবে। তার পাশে এমন পেশাদারদের আনতে হবে যারা সঠিক পরামর্শ দিতে পারে এবং এটি এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত।
বিশ্লেষক দিলার চৌধুরী এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভেতরে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। হাসিনা শাসনামলে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার অনেক বিএনপি নেতা এখন নিজেদের দলের সাইড লাইনে দেখতে পাচ্ছেন, যা তরুণ ভোটারদের কাছে তারেক রহমানের গ্রহণযোগ্যতাকে কমিয়ে দিতে পারে।
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, তারেক রহমান যখন লন্ডনে ছিলেন, তখন দেশে যারা তার ও দলের পাশে ছিলেন, তাদের চেয়ে তার আশপাশে থাকা মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটা নিয়ে দলের ভেতরে এরই মধ্যে গ্রুপিং শুরু হয়েছে।
পারিবারিক রাজনীতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তারেক রহমান কঠিন অবস্থানে আছেন। যদি দল ভূমিধস জয় না পায় তাহলে তার ওপর দায় চাপানো হবে। আর সহজভাবে জিতলেও অনেকে বলবে, সেটা স্বাভাবিক, তারেক রহমানের এখানে বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে হিসেবে তিনি দেশের একটি রাজনৈতিক পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। যা একদিকে তার সমর্থন জোগায়, অন্যদিকে তরুণদের একাংশ এর সমালোচনা করে।
আলজাজিরার সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অস্বাভাবিক নয়। যোগ্য, জবাবদিহিমূলক ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকলে উত্তরাধিকার নেতৃত্বের অযোগ্যতা প্রমাণ করে না।
প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানকে একজন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হলেও বিশ্লেষকরা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন বিষয়টি।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা সুবায়েল বিন রফিক বলেন, ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমান ও দল হিসেবে বিএনপি দুটি ভিন্ন জিনিস। আমি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে, সংগঠন হিসেবে দলের পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো নয়।
অন্যদিকে, বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বিএনপিকে সমর্থন করতে পারে। কারণ তারা এটিকে পরিচিত আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার মতো দেখতে পারে। এর ফলে তারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়। নির্বাসন থেকে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কি অতীতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন ধারা তৈরি করবে, নাকি নতুন নেতৃত্বের আড়ালে পুরোনো চক্রের কেবল ফিরে আসা।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান বলেন, অতীতে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই।