বিদ্রোহীদের দাপটে ‘কোণঠাসা’ ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থীরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে নির্বাচনি আমেজ চলছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে ধানের শীষ প্রতীকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ভোটের মাঠে দলটির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন। এরই মধ্যে দেশের ৭৯টি আসনে বিএনপির অন্তত ৯২ জন নেতা বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এসব বিদ্রোহী প্রার্থীরাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
বেশকিছু আসনে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের পাশাপাশি নিজ দলের বহিষ্কৃত বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিএনপির প্রার্থীদের।
ঢাকা-৭ : এই আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও পুরান ঢাকায় তার শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান হামিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করছেন জামায়াত জোটের মো. এনায়াত উল্লা।
ঢাকা-১২ : প্রথমে এই আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরবকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরিবর্তন করে জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হককে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি কোদাল প্রতীকে নির্বাচন করবেন।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন নীরব। বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠে বেশ প্রভাব রয়েছে নীরবের। এই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. সাইফুল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করবেন।
ঢাকা-১৪ : গুম হওয়া ব্যক্তিদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলিকে বিএনপি মনোনয়ন দিলেও এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস. এ. খালেকের ছেলে সাজুর মাঠেও বেশ প্রভাব রয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী দীর্ঘ ৮ বছর ‘আয়নাঘরে’ গুম থাকার পর ফিরে আসা মীর আহমাদ বিন কাসেম।
টাঙ্গাইল-৫ : বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে বিপরীতে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
টাঙ্গাইল-৩ : এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে একাধিকবারের সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় নাসির চাপে পড়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ : বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভূঁইয়া। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসম্পাদক মোহাম্মদ দুলাল হোসেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নোয়াখালী-২ : বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সেনবাগ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মফিজুর রহমান। তার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ : এ কে এম কামরুজ্জামান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ হান্নান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ : এই আসনে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক কাজী নাজমুল হোসেন নির্বাচন করছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ : এখানে বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্মসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিলেও বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এস এন তরুণ দে, যিনিও বহিষ্কৃত।
রুমিন ফারহানা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি। আমার ভোটাররাই আমার শক্তি ও সাহস।’
পটুয়াখালী-৩ : এই আসনে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয়। কিন্তু এই আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দেন বিএনপি নেতা হাসান মামুন। পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
যা বলছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা
বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক। সব দিক বিবেচনা করেই দল মনোনয়ন দিয়েছে। যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা এখনো বিশ্বাস করি, সময় এলে সবাই ধানের শীষের পক্ষে একযোগে কাজ করবেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মূলত বাধ্য হয়েই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিএনপি সংশ্লিষ্টদের যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সেই সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের তৎপরতা সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নেয়নি। ফলে তারা ধানের শীষের বাইরে গিয়ে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবেন বলে আমরা মনে করি না।’