দল বদলের গুঞ্জনে ‘নীরব’ রুমিন ফারহানা, এনসিপির স্থানীয় নেতারাও জানেন না কিছু

জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগদানের খবর নিয়ে গেল কয়েক দিন ধরে ব্যাপক শোরগোলের পরও এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। যদিও দল বদলের গুঞ্জন ব্যাপকমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে গুজব নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি ইংরেজি উদ্ধৃতি পোস্ট করেছেন তিনি। এনসিপিতে যোগ দেওয়ার খবরটি যে সত্য নয়—পরোক্ষভাবে হয়তো সেটাই জানান দিয়েছেন ওই পোস্টের মাধ্যমে।
কিন্তু এর আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে একযোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে গুজবের ডালপালা। রুমিন ফারহানা তার স্বভাবজাত রীতি অনুযায়ী তীক্ষ্ণ এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া না জানানোর কারণে এ নিয়ে বিভ্রান্তি আরও জোরালো হয়েছে। কেউ কেউ বাকপটু রুমিনের ‘নীরবতাকে রহস্যময়’ বলেও মনে করছেন।
সরাইল ও আশুগঞ্জে রুমিন ফারহানার অনুসারী হিসেবে পরিচিত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারাও এ খবর শুনেছেন। কিন্তু নেত্রী এখনও তাদের এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা নির্দেশনা দেননি। সেটি না পাওয়া পর্যন্ত ওই খবর তারা বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না। অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, খবরটি ভিত্তিহীন। এমন খবরের গুরুত্ব বাড়াতে চান না বলেই রুমিন ফারহানা ‘নীরব’ আছেন।
রুমিন ফারহানার এনসিপিতে যোগদানের আলোচনা নিয়ে দলটির সরাইল-আশুগঞ্জের দায়িত্বশীল নেতারা দলীয়ভাবে অবগত নন। দলের হাইকমান্ড থেকে এখনও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা বা আভাস পাননি। তবে ঘটনা সত্য হলে রুমিন ফারহানাকে দলে স্বাগত জানাতে তারা প্রস্তুত প্রস্তুত তারা।
দল বদলের রাজনীতি ও গুজবের ডালপালা
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে দল বদলের সিদ্ধান্ত অনেক সময় বিস্ময়কর হলেও বিরল কোনো ঘটনা নয়। বরং এমন বহু রাজনীতিবিদ রয়েছেন যারা দল বদলে ‘পটু’ হিসেবে রীতিমতো খ্যাতি অর্জন করেছেন। দল পরিবর্তনের বেশির ভাগ ঘটনায় আদর্শের চেয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, মতের অমিল কিংবা প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধের মতো ঘটনাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগেও এমন একাধিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন দেশের মানুষ। অন্য দলের মনোনয়ন পেয়ে সহজে সংসদে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কয়েকজন রাজনীতিক নিজের দল বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন অবলীলায়। কেউ কেউ নিজ দলের শীর্ষ অবস্থান ত্যাগ করে শুধু মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য অন্য দলে পদহীন নেতা হিসেবে যোগ দিতেও পিছপা হননি।
নিকট অতীতের এমন চমকপ্রদ সব নজির সামনে থাকায় রুমিন ফারহানার দল বদলের গুঞ্জনও হয়তো অনেকের কাছে অবিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কারণ, দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অপরাধে জাতীয় নির্বাচনের আগেই রুমিন ফারহানাকে তার দল বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আবার সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের সমালোচনা করে বক্তব্যও দিচ্ছেন তিনি। এসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে অতিউৎসাহী অনেকে ধরেই নিয়েছেন, এনসিপিতে রুমিন ফারহানার যোগদানের বিষয়টি সত্য হলেও হতে পারে।
বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে এ গুঞ্জন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার ঢল নেমেছে। যদিও দশটি পরিচিত-অল্প পরিচিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রতিবেদনের বক্তব্য, বাক্যগঠন এবং শব্দচয়ন প্রায় অভিন্ন! অবাক করা বিষয়, কোনো প্রতিবেদনেই গুঞ্জনের উৎস কিংবা রুমিন ফারহানার বক্তব্য নেই। আবার এনসিপির যে নেতাদের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যেও এ নিয়ে বিস্তারিত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য নেই। এরপরও সব প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলা হচ্ছে, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত রুমিন ফারহানার এনসিপিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন।
ফেসবুকে রুমিনের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট, তবু ধোঁয়াশা
সারা দেশের চেয়ে রুমিন ফারহানার নির্বাচনি এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় এ খবর বেশি আলোড়ন তুলেছে স্বাভাবিকভাবেই। এ নিয়ে রুমিন ফারহানার অনুসারী নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, নানাজনের কাছে এমন কথা শুনছেন, তবে রুমিন ফারহানার কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো বার্তা পাননি। তাই বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন তারা। রুমিন ফারহানা নিজেই যেন এ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছেন। তার এনসিপিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন নিয়ে গেল কয়েক দিন একাধিক পরিচিতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেননি তিনি। এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও রুমিনের সাড়া মেলেনি। এমনকি তার এপিএসকে কল-মেসেজ দিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অবশ্য শনিবার (১১ এপ্রিল) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বহুল প্রচলিত একটি ইংরেজি উদ্ধৃতি পোস্ট করেছেন রুমিন ফারহানা। বাংলায় ওই উদ্ধৃতির অর্থ দাঁড়ায় এমন—গুজব রটায় নিন্দুকরা, ছড়ায় বোকারা, আর বিশ্বাস করে গাধারা!
ওই পোস্টে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী কমেন্ট করেছেন, ‘যাহা রটে তাহা কিছুটা হলেও বটে—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদের সাথেও কিন্তু আমরা পরিচিত।’
কমেন্টের রিপ্লাই দিয়ে রুমিন লেখেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা বলে, এ প্রবাদ রাজনীতিতে প্রযোজ্য নয়।’
কোন প্রেক্ষাপটে, কোন বিষয়ে রুমিন ফারহানা এ পোস্ট দিয়েছেন তা উল্লেখ না করলেও অনেকের ধারণা, এনসিপিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জনকেই গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন রুমিন ফারহানা। বিষয়টি হয়তো এতটাই ভিত্তিহীন যে বক্তব্য দিয়ে এ ঘটনার গুরুত্ব বাড়াতে চাইছেন না তিনি।
এ নিয়ে কথা হয় সরাইল উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাসেলের সঙ্গে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষ না দিয়ে দলীয় নির্দেশ অমান্য করেই রুমিন ফারহানার নির্বাচনে কাজ করেছেন রাসেল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য আমাদের কাছে নেই। কিছু আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তবে বিষয়টি গুজব বলেই মনে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রুমিন ফারহানার মতো আলোচিত ব্যক্তিকে নিয়ে গুজব ছড়ানো রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। এনসিপিতে যোগদানের গুজবে কেউ কান দেবেন না।’
সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় রুমিন ফারহানার অনুসারী হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। তারা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু না জানলেও দল বদলের সম্ভাবনার খবরকে গুজব বলেই সাব্যস্ত করছেন তারা। কারণ, তাদের বিশ্বাস নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা না করে রুমিন ফারহানা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
অনুসারীরা বিশ্বাস ধরে রেখেছেন, তবে স্থানীয় ভোটাররা দ্বিধার মধ্যে পড়েছেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এবং রাজনীতি সচেতন হিসেবে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। বিভিন্ন মাধ্যমে এ গুঞ্জন দেখে কেউ কেউ কিছুটা বিস্মিত হলেও আগ বাড়িয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বললেন, রাজনীতিতে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। ইতিহাসে নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক দল বদলের অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে রুমিন ফারহানা যেহেতু বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী, আমরা চাই যে অবস্থানে থাকুন না কেন, তিনি যেন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে যান।
এনসিপির স্থানীয় নেতারাও জানেন না কিছু
এদিকে সরাইল উপজেলা এনসিপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানান, রুমিন ফারহানার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্তের খবর তারা পাননি। বিষয়টি গুজব বলেই মনে করছেন তারা। তবে সত্যিই যদি কেউ দলে যোগ দেন, তাহলে তাকে অবশ্যই স্বাগত জানানো হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ ধরনের গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নয়। রুমিন ফারহানা স্পষ্টভাষী মানুষ। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী ও জনগণের জন্য কাজ করতে চান। আমাদের এনসিপির মূলনীতিও জনগণের অধিকার জনগণকে ফিরিয়ে দেওয়ার।
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, তিনি (রুমিন ফারহানা) আমাদের দলে যোগ দিতে চাইলে দলের নীতিনির্ধারকরা নীতিমালার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবেন; কীভাবে সম্মানের সঙ্গে তাকে রুমিন ফারহানাকে দলে যোগদান করানো যায়।