গণভোটের রায় না মানলে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে: এ টি এম আজহার

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি সময় থাকতে সহজে মেনে নেয়নি। অনেক রক্তের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বিএনপি সরকারকে বাধ্য করা হয়েছে। আজও বিএনপি সময় থাকতে সহজে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে। রাজপথের আন্দোলন সরকারের জন্য সুফল আনে না।
শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থানের প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, এক দলকে বিদায় করে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাতে জুলাই বিপ্লব হয়নি। জুলাই বিপ্লব হয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার জন্য রচিত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য। এজন্যই সংবিধান সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, জেল-জুলুম, অত্যাচারের ভয় দেখাবেন না। এসব পার করে এখানে এসেছি। যদি দেশের ভালো চালাতে চান, তবে সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব। কিন্তু আপনারা জনগণের বিপক্ষে গেলে জামায়াতে ইসলামী জনগণের পক্ষে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেই অধ্যাদেশগুলো বিএনপি সরকারের খুব পছন্দ। কিন্তু যেই অধ্যাদেশগুলো জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহিতে বাধ্য করে সেই অধ্যাদেশগুলো বিএনপির খুবই অপছন্দ। এজন্য বিএনপি বাছাই করে সেই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার পথে হাঁটছে। বিএনপির রাজনীতি একদিকে সুবিধাবাদী আরেকদিকে মুনাফেকি। তারা মুখে এক কথা বলে, কাজে আরেকটা করে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর গণভোটের রায় তারা মেনে নিচ্ছেন না। ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না।
তিনি ২৮ অক্টোবরের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএনপির ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে ২৮ অক্টোবর। আবারও যদি বিএনপির ভুলের খেসারত দিতে হয় তবে দেশবাসী বিএনপিকে আর ক্ষমা করবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ নির্বাচন বৈধ হলেও জনগণের ভোটে গণভোট জয়যুক্ত হওয়ার পর বিএনপি গণভোটকে বলে অবৈধ। বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটের বিপক্ষে কথা না বললেও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিএনপির হওয়ায় তারা জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য অবশ্যই সংবিধান লাগবে। কিন্তু সেই সংবিধান মুজিববাদের সংবিধান নয়, শেখ হাসিনার সংবিধান নয় বা বিএনপির মনগড়া সংবিধান নয়। সংবিধান হতে হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে দলীয়করণ বন্ধ হবে, একনায়কতন্ত্র বন্ধ হবে, সংসদে উচ্চ কক্ষ গঠন হবে এজন্যই বিএনপি গণভোট মানে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে একই তপশিলে দুটি নির্বাচন হয়েছে। একটি সংসদ নির্বাচন অপরটি গণভোট। নির্বাচনের পর কমিশন শপথ গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রত্যেক সদস্যকে দুটি শপথ ফরম দিয়েছে। বিএনপি শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে। তারা গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যারা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা কখনো জনপ্রতিনিধি হতে পারে না। তারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন করা সংসদের রুটিন কাজ। রুটিন কাজের জন্য জুলাই বিপ্লব হয়নি, গণভোট হয়নি। জুলাই বিপ্লব ও গণভোট হয়েছে সংস্কারের জন্য। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুবা জনগণ আবারও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে। জনগণ রাজপথে নেমে আসলে পালানোর জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, গণভোট অবৈধ হলে সংসদ নির্বাচনও অবৈধ। বিএনপি সরকার জনগণের বিপক্ষে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের বিপক্ষে কেবলমাত্র ফ্যাসিবাদী সরকার হাঁটে। বাংলাদেশে কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে না, চলতে দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুফতি মোখলেছুর রহমান কাসেমী বলেন, যারা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে তাদেরকে ছাত্র-জনতা মাত্র ৩৬ দিনে ১৭ বছরের ক্ষমতার মসনদ ভেঙে দিয়েছে। আজকে যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না তাদেরকে ৩৬ দিন নয় ৩৬ ঘণ্টায় বিতাড়িত করতে পারে এদেশের ছাত্র-জনতা।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. ওমর ফারুক বলেন, গণভোটের রায় মেনে না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতিকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে এখন জনরায় মেনে নিচ্ছেন না। কীভাবে জনরায় বাস্তবায়ন করা লাগে জনগণ সেটি ভালো করেই জানে। সোজা পথে না আসলে জনগণ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে। একটি সংসদ নির্বাচন আরেকটি গণভোটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য নির্বাচন। কিন্তু বিএনপি ম্যানেজ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে সংসদ নির্বাচন মানলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ মানে না। তাদের ভাষায় সংসদ নির্বাচন বৈধ, গণভোট অবৈধ।
তিনি বলেন, জনগণই নির্ধারণ করবে কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল হক চাঁন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির প্রতারণা জনগণ বুঝে গেছে। সরকার গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নাইটিঙ্গেল হয়ে কাকরাইল গিয়ে শেষ হয়। এ সময় হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরেন।