Advertisement

যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে বিতর্ক: ত্যাগীদের বঞ্চনার অভিযোগ

এশিয়া পোস্ট নিউজ
যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে বিতর্ক: ত্যাগীদের বঞ্চনার অভিযোগ
ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘ ২৩ মাসের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কমিটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষ, ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তদবির করে পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

Advertisement

নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও নির্যাতিত ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং ব্যক্তিগত আনুগত্য, লবিং এবং বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাবকে প্রাধান্য দিয়ে পদায়ন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হয়।

এর আগে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুগত অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

ত্যাগী নেতাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ

দলীয় সূত্র ও বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা একাধিক নেতার নাম ঘোষিত কমিটিতে নেই। এতে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তাদের অনুসারীদের মধ্যে।

বঞ্চিতদের তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মেহবুব মাসুম শান্ত। নেতাকর্মীদের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে শান্ত রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরও নতুন কমিটিতে তাকে কোনো পদ না দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মামুন খানও কমিটিতে স্থান পাননি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, বিরোধী দলে থাকাকালীন তিনি একাধিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

একইভাবে কুমিল্লা বিভাগীয় যুবদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি তাজুল ইসলাম, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি তবিবুর রহমান সাগর, সাইফুল ইসলাম এবং বরিশাল বিভাগীয় যুবদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক সুমন দেওয়ানও নতুন কমিটিতে স্থান পাননি।

নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অনেকেই এবার মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

পদায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন

নতুন কমিটির একাধিক পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের অতীতে বিএনপি কিংবা এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক ভূমিকার কোনো নজির নেই।

বিশেষ করে ক্রমিক নম্বর ৯৩-এ সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পাওয়া আরিফুর রহমান সোহেলকে নিয়ে আলোচনা চলছে। নেতাকর্মীদের দাবি, আগে কোনো সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন না করেও তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান পেয়েছেন। তিনি বিগত ১৭ বছর একদম নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

একাধিক নেতার অভিযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও আন্দোলনে ভূমিকার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং লবিং অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিষ্ক্রিয় নেতাদের পুরস্কৃত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবঘোষিত কমিটির এক যুগ্ম সম্পাদক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মনিরুল ইসলাম সোহাগকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছে। অথচ বিগত প্রায় ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে ১৭ মিনিটও রাজপথে দেখা যায়নি। একইভাবে গোলাম মোস্তফাও দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তারপরও তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।’

তার দাবি, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় মনিরুল ইসলাম সোহাগ গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘যারা আন্দোলনের কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, গ্রেপ্তার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এবার যথাযথ মূল্যায়ন পাননি।’

একই অভিযোগ উঠেছে নবনিযুক্ত ২ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে ঘিরেও। নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তিনি একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। গত ১৭ বছর আন্দোলন তো দূরের কথা, তাকে একবারের জন্যও নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেখা যায়নি। তারপরও তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলন সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকা খন্দকার আল আশরাফ মামুন যুগ্ম সম্পাদক পদ ভাগিয়ে নিয়েছেন।

আতিকুর রহমান আতিককে ঘিরে আলোচনা

যুবদলের নতুন কমিটিতে সহসভাপতি পদ পাওয়া আতিকুর রহমান আতিককে নিয়েও সংগঠনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নীরব-টুকু কমিটির সময় তিনি সহসাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে টুকু-মুন্না নেতৃত্বাধীন আংশিক কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি।

কিন্তু এবার পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাকে সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক নেতাকর্মী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সাংগঠনিক সক্রিয়তা বা রাজনৈতিক অবদানের চেয়ে সভাপতির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগই তার পদোন্নতির প্রধান কারণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দলীয় গ্রুপ এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক ফোরামে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

কমিটিতে পদ না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আসাদুল আলম টিটু। তিনি লিখেছেন, ‘রাজপথ বেইমানী করলো কেন জবাব চাই?’

এ ছাড়া কয়েকজন প্রবাসী নেতার পদ পাওয়ার বিষয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক সহসাধারণ সম্পাদক এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'সৌদি আরবপ্রবাসী যুগ্ম সম্পাদক হারুনর রশিদ হিরো, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সহসভাপতি আবু সাঈদ আহমেদ অর্থের বিনিময়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেয়েছেন।

তবে রিপোর্ট প্রকাশের পর এ অভিযোগের বিষয়ে হারুনর রশিদ হিরো এশিয়া পোস্টের কাছে দাবি করেন, তিনি সৌদি প্রবাসী নন, তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। পদ পাওয়ার জন্য কোনো রকম আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন বলেও তিনি দাবি করেছেন।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিংবা নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হয়েছে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে এবং সাংগঠনিক মনোবলেও প্রভাব পড়তে পারে।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীরবতা

এদিকে কমিটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ ও সমালোচনার বিষয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পবিত্র হজ পালনের জন্য বর্তমানে তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে তিনি সেই বার্তা দেখেছেন, কিন্তু কোনো উত্তর দেননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের নম্বরে কয়েকবার কল করা হলেও তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।

সংগঠনের ভেতরে চলমান এই অসন্তোষ ও বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পরপরই যে প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যুবদলের নতুন নেতৃত্ব, তা নিয়ে দলীয় অঙ্গনজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।