ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতির স্ট্যাটাস

ছাত্রদলের নতুন কমিটির জন্য আগাম শুভকামনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে রাকিব-নাসিরের বিদায়ী কমিটির প্রতি দোয়া ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ছাত্রদলের নতুন কমিটি ও কিছু কথা শিরোনামে ওই পোস্টে ৭টি পয়েন্টে কথা বলেছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি।
তিনি লিখেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও তাঁদের শেষ কার্যদিবস ও স্মৃতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখনো নতুন কমিটি গঠনের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
জাহিদুল ইসলাম লিখেন, শোনা যাচ্ছে, নতুন নেতৃত্বের জন্য বিএনপির চেয়ারপারসন ও শীর্ষ নেতাদের সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাদের আশীর্বাদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। দূর-দূরান্ত থেকে লোক ভাড়া করে এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করানো, নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতার প্রদর্শন— এসবও যেন নেতৃত্ব পাওয়ার অন্যতম যোগ্যতা হয়ে উঠেছে। ছাত্রদলের মত একটি সংগঠনে নেতৃত্বের এই চর্চা কতটা গণতান্ত্রিক?
তিনি বলেন, যারা গণতন্ত্রকে নিজেদের মৌলিক নীতিমালা হিসেবে প্রচার করেন, তাদের কাছে প্রশ্ন— অধস্তন কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জনের পরিবর্তে কেন নেতৃত্বের জন্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মন জয় করাই প্রধান প্রতিযোগিতার বিষয় হবে? কার সঙ্গে কতজন ‘হাই-ভোল্টেজ’ নেতার যোগাযোগ আছে, কার পেছনে কত বড় রাজনৈতিক ছায়া রয়েছে— যদি নেতৃত্ব নির্ধারণে সেটিই প্রধান বিবেচনা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের কথা বলার সঙ্গে বাস্তব চর্চার কতটা মিল থাকে?
বয়সের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আমি পক্ষপাতী নই মন্তব্য করে সাবেক সিপি বলেন, এটি মূলত তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক নীতিমালার বিষয়। তবে বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় কমিটির কথা বাদ দিলেও ছাত্রদলের মহানগর, জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন অনেকেই দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের বয়স ৩৫ বছর বা তারও বেশি। একটি ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক বেশি বয়সী ব্যক্তিদের অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য— সেটি অবশ্যই সংগঠনটির নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা উচিত। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, দীর্ঘদিন ধরে পদ আঁকড়ে থাকার কারণে অনেক নতুন ও উদীয়মান নেতা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিজেদের সাংগঠনিক স্বার্থেই ছাত্রদলের বয়সসংক্রান্ত নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যায়, ছাত্রদলের কমিটিতে ‘পদ বাণিজ্য’ একটি বড় সমস্যা। এটি সত্য কি না, আমি নিশ্চিত না। তা ছাত্রদলের নেতৃত্বই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে যদি এমন অভিযোগের সামান্যও সত্যতা থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ অর্থ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে পদ বণ্টন হলে ত্যাগী ও কর্মীরা বঞ্চিত হন। একটি ছাত্রসংগঠন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নেতৃত্বে উঠে আসেন যোগ্যতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কর্মীরা। অন্যথায় প্রতিযোগিতামূলক ছাত্ররাজনীতিতে টিকে থাকা ছাত্রদলের জন্যই কঠিন হয়ে পড়বে।
ছাত্রদলের প্রতি পরামর্শ জানিয়ে জাহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের কমিটিতে কথিত ‘গুপ্ত ছাত্রলীগ’ কিংবা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থান পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে তাদের কয়েকজনকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এ ঘটনা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে— কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় কোথাও না কোথাও দুর্বলতা রয়েছে। আশা করি, আগামী দিনে এক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিবেন। কোনো গুপ্ত ছাত্রলীগ, ফ্যাসিবাদের সহযোগী কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিকে যেন নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া না হয়— এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ছাত্রদলের কল্যাণ কামনা থেকেই বলছি— শুধু বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পেছনে দৌড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন। ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে যদি কর্মীদের আস্থা, ত্যাগ, যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার চেয়ে ওপরের মহলের সুপারিশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি শুধু ছাত্রদলের জন্য নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতির জন্যও হতাশাজনক। ছাত্ররাজনীতির আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। সম্ভব হলে কাউন্সিলের মাধ্যমে, কর্মীদের ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করা যেতে পারে। এতে নেতৃত্বের প্রতি কর্মীদের দায়বদ্ধতা যেমন বাড়বে, তেমনি নেতৃত্বও তৃণমূলের কাছে জবাবদিহিমূলক হবে।
সদ্য বিদায়ী রাকিব-নাসিরের কমিটির প্রতি শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, বিদায়ী কমিটির অনেক ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। সেসব নিয়ে সমালোচনা থাকবেই। তারপরও জুলাইয়ের কঠিন সময়ের নেতৃত্ব ও সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের প্রতি রইল দোয়া ও ভালোবাসা। রাকিব-নাসির ভাইয়েরা ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আগামীদিনেও আমাদের পাশে থাকবেন। জাতীয় রাজনীতিতে জুলাইয়েত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি নতুন কমিটির জন্য রইল অগ্রিম শুভকামনা।





