তরুণদের ভোট টানতে বিএনপি-জামায়াতের নানা কৌশল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই হয়ে উঠেছেন জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক। মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ হওয়ায় তাদের ভোট কার ঝুলিতে যাবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু। এ বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তরুণদের আকৃষ্ট করতে নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে।
নতুন ও অপেক্ষমাণ ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহের ঘাটতি নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিতই মিলছে।
১০ বছর আগে ভোটার হয়েছেন তুনাজ্জিনা জাহান। আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুটি একতরফা নির্বাচন দেখলেও বিতর্কিত পরিস্থিতির কারণে ভোটকেন্দ্রে যাননি তিনি। এখন বয়স ২৮। বয়সে এগোলেও এবারই কার্যত প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে মনে করছেন তিনি।
প্রথম ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা তুনাজ্জিনা জাহান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান— যে দল এসব বাস্তবায়ন করবে, তাকেই ভোট দেবেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে বিএনপি ও তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ভোটের মাঠে রয়েছে, যারা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে শরিক।
রাজনীতির এই নতুন বিন্যাসে তরুণদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা আগাম বলা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তাদের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে— এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে বড় একটি অংশের তরুণ ভোট দিতে পারেনি। ফলে অনেকের জন্য এবারের নির্বাচন হবে প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ, যা তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা প্রযুক্তিনির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম। সামাজিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও তারা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এগিয়ে।
তাই তরুণরা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা সহজে অনুমান করা যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধ বা গণতন্ত্রের ইতিহাস অস্বীকার না করলেও তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ— আগামী দিনে নিজেদের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ঋদ্ধি দাস বলেন, আমি প্রার্থীর অতীত দেখব— তারা আগে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করেছে কি না। কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে কি না, সেটাই বিচার করব।
কর্মসংস্থান, কর্মমুখী শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, মতপ্রকাশের নিরাপত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান— এই বিষয়গুলো তরুণদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত অবস্থান, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও স্পষ্ট রূপরেখাই তরুণদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নন— এর বাইরের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তও নির্বাচনের হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারে। ফলে তরুণ ভোট কোন দিকে যাবে, তা বলা কঠিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহুরে তরুণদের সরব উপস্থিতির কারণে ডিজিটাল প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সে তরুণরা প্রার্থী ও দলের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও মতামত দিচ্ছেন।
প্রথমবার ভোট দিতে আগ্রহী তুনাজ্জিনা জাহান বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এখন একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সব দিক জানা সম্ভব। যার ব্যাকগ্রাউন্ড পরিচ্ছন্ন এবং তরুণদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেবে— দলীয় পরিচয় না দেখে তাকেই ভোট দেবেন তিনি।
তবে গ্রামীণ বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে অনেক তরুণ-তরুণী এখনো পরিবার, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্থানীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ২০ বছর বয়সী শারমিন আক্তার এবার প্রথম ভোট দেবেন। কিন্তু সিদ্ধান্তহীন তিনি। শারমিন জানান, ভোট কীভাবে দিতে হয় তাও ঠিক জানেন না। পরিবারের সিদ্ধান্তই অনুসরণ করবেন।
তরুণ ভোটে বিএনপির হিসাব
দীর্ঘ বিরতির পর সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী মাঠে ফিরেছে বিএনপি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তরুণদের আকৃষ্ট করতে দলটি ইতিবাচক রাজনীতি ও ভবিষ্যৎমুখী প্রতিশ্রুতিকে সামনে আনছে।
২৫ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিএনপির রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। জনভোগান্তিমূলক কর্মসূচি এড়িয়ে দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক রাজনীতির বার্তা দিচ্ছে দলটি।
তরুণদের টানতে বিএনপির স্লোগান— ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক।’ যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ইশতেহার প্রকাশ হয়নি, তবে ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের ভাতা, আইটি পার্কে অফিস স্পেস, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ফ্রিল্যান্সারদের আয় দেশে আনার বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
এ ছাড়া তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক্রম, শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়ন ও আউটসোর্সিং সম্প্রসারণের কথাও বলা হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় থিম সং, ভিডিও ও রিলসের মাধ্যমে তরুণদের কাছে বার্তা পৌঁছাচ্ছে বিএনপি। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, অপপ্রচার বা চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে দূরে থেকেই ইতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দীর্ঘদিনের নিপীড়নের অভিজ্ঞতাও তরুণদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে।
জামায়াতের তরুণমুখী প্রচেষ্টা
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপের পর এবারের নির্বাচনকে পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী।
জুলাইয়ের চেতনা ও ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট ছড়িয়ে তরুণদের টানছে দলটি। পলিসি ডায়ালগে পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ইয়ুথ টেক ল্যাব, জেলা পর্যায়ে জব ইয়ুথ ব্যাংক, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে জামায়াত।
তবে দলটির নারী নীতি ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এনসিপির ভরসা তরুণরাই
প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্ব ও প্রার্থীদের বড় অংশ তরুণ। তাই তাদের প্রচারের মূল ফোকাসও তরুণ ভোটার।
মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় র্যাপ, ফোক ও আধুনিক সুরে থিম সং, শর্ট ভিডিও ও রিলস প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জেন-জি ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
এনসিপির নেতারা জানিয়েছেন, ইশতেহারে কর্মসংস্থান, কর্মমুখী শিক্ষা, বেকার ভাতা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তরুণরা আর কেবল একটি ভোটব্যাংক নয়; তারা রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এক শক্তি।
সূত্র : বিবিসি বাংলা