আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বান সারোয়ার তুষারের

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার বলেছেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দলটির শাসনামলের অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত না করায় সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পুনর্মিলনের বদলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে পরিণত হয়েছিল। তিনি বিএনপিকে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বান জানান।
শনিবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ন ট্রেড সেন্টারে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান: বর্তমানের প্রেক্ষাপটে ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সারোয়ার তুষার বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা ছিল। বাকশাল তথা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে।
জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেন, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে রাজনীতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এটাই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত করার পর কিছু প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তিও সেখানে জায়গা পেয়েছিল এবং এর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে।
১৫ আগস্টের পরের সরকারব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই সময় খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন একজন বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বে গঠিত সরকারেও আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন। ২০ আগস্ট জারি করা সামরিক ফরমানেও সংবিধান বহাল রাখার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধান বাতিল না করেই সামরিক ফরমানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবিধান ও রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে যখন আলোচনা হয়েছে, তখন সংবিধান বহাল রেখে একটি ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সেই উদ্যোগ আটকে দিয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
সারোয়ার তুষার বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, বিভিন্ন দল থেকে লোকজন নিয়ে সংগঠন তৈরি করেছেন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করেছেন। এ কারণে এনসিপিকে ‘কিংস পার্টি’ বলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দল হলে এনসিপি বা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন ক্ষমতায় থাকতেন। জিয়াউর রহমানের দল পরবর্তী সময়ে জনভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল বলেই তাকে শুধু ক্ষমতাসীনদের তৈরি দল হিসেবে দেখা যায় না।
এনসিপির এই নেতা বলেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবদান থাকলেও তার শাসনামলের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে দেয়নি। সামরিক আইনের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে পরে সেগুলোকে পুরোনো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা ছিল একটি বড় ভুল।
বিএনপির উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে গণভোট হয়েছে, খালেদা জিয়ার আমলেও গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপির ইতিহাসে গণভোটের গুরুত্বপূর্ণ নজির থাকা সত্ত্বেও সেই দলের বর্তমান নেতৃত্ব এখন গণভোটের ম্যান্ডেট থেকে সরে আসছে কেন?
সারোয়ার তুষার বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে গুপ্তচর খুঁজছেন। অথচ নিজের দলের ভেতরে কারা সরকারকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন, সেটিও খুঁজে দেখা উচিত। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ওই ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ৪ আগস্ট একটি বাড়ি ভাঙচুরের কথা বলেছেন। অথচ ৫ আগস্টের পরের ভাঙচুরের দায় এনসিপির ওপর চাপানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবও একটি কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার কথা গর্বের সঙ্গে বলেছেন। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্যের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা দেখা যায় না। অথচ এনসিপির কেউ এমন কথা বললে গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হতো।
বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে সারোয়ার তুষার বলেন, অন্যদের মধ্যে গুপ্তচর খোঁজার আগে নিজেদের দলের ভেতরে কারা ভুল পরামর্শ দিচ্ছেন, তা খুঁজে বের করা উচিত। আওয়ামী লীগের প্রশ্নে জিয়াউর রহমান যে ভুল করেছিলেন, বিএনপি যেন দ্বিতীয়বার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বলেন, সংবিধানে কোনো বিধান থাকুক বা না থাকুক, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও রায়ই রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় বৈধতার উৎস। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েছিলেন, একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়ও মেনে নেওয়া উচিত। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জনগণের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির মিডিয়া সম্পাদক ইয়াসির আরাফাতের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় দলের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাকের সামরিক আইন জারির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কোন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা বোঝা জরুরি। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কীভাবে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, সেটিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
