জামায়াত ও আওয়ামী লীগ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান মুখ মাহফুজ আলম। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হলো আওয়ামী লীগের ‘অল্টার ইগো’ বা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-এ প্রচারিত সাড়ে ১৪ মিনিটের সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। তার মতে, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকলে জামায়াতও থাকবে, আর জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগও থাকবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে নিয়ে জামায়াতের স্বচ্ছ কোনো ভিশন বা পরিকল্পনা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না মাহফুজ আলম। ভোটের মাঠে তার এই সরে দাঁড়ানো পুরোনো খবর হলেও, এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে তিনি জামায়াত ও আওয়ামী লীগের এই পারস্পরিক অস্তিত্বের সমীকরণকেই মূলত সামনে এনেছেন।
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম জানান, তিনি চেয়েছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণ শক্তিগুলোকে এক করে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ বা থার্ড অল্টারনেটিভ গড়ে তুলতে। তবে, এনসিপি যখন পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের’ অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন সেই ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ার স্বপ্ন পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি আরও কড়া ভাষায় বলেন, ‘যাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছে, তারা পুরোনো কাঠামোরই অংশ। জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এমন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যার কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। কারণ, বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের স্বচ্ছ কোনো ভিশন বা পরিকল্পনা নেই।’
তিনি মনে করেন, আদর্শিক জায়গা ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি সব দিক থেকেই জামায়াতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন সম্ভব নয়। এক পর্যায়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত দেড় বছরের যাত্রা ছিল এক ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র মধ্য দিয়ে যাওয়া। যেখানে তার দৃষ্টিতে, পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সিস্টেম’ নতুন মোড়কে আবার ফিরে আসছে, যা জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যত সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক করে মাহফুজ আলম বলেন, ক্ষমতায় যে দলই আসুক, সমাজের ভেতরে থাকা ক্ষত সারাতে না পারলে কোনো সরকারই টিকবে না।
তিনি বলেন, “শুধু কাগজে-কলমে সংস্কার করলেই হবে না। সমাজে যদি ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমঝোতা বা ‘রিনেগোসিয়েশন’ না হয়, তবে সমাজে মব ভায়োলেন্স বা বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।” সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মাহফুজ আলম। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করে না। এই বিশ্বাস ফেরাতে হলে গণমাধ্যমকে জনগণের কাছে তাদের অতীতের ভূমিকার জন্য এক ধরণের ক্ষমা বা বোঝাপড়ার জায়গায় আসতে হবে। বর্তমানে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মাহফুজ আলম এখন বই পড়ে এবং হতাশ তরুণদের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাচ্ছেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা গেল না এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এগোতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়লে সে মাসের ৮ তারিখে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ২৮ আগস্ট তিনি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান। একই বছরের ১০ নভেম্বর সরকারের উপদেষ্টা হন মাহফুজ আলম। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।