logo

দেশের নির্বাচনী রণক্ষেত্র এখন টিকটক-ফেসবুক-ইউটিউব

দেশের নির্বাচনী রণক্ষেত্র এখন টিকটক-ফেসবুক-ইউটিউব

‘নৌকা ধানের শীষ লাঙল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ’— ছন্দনির্ভর এই গানের কথাগুলো শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে, এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের জীবনযাপন নিয়ে কোনো সামাজিক মন্তব্য।

কিন্তু বাস্তবে এটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী গান। এটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে তৈরি একটি রাজনৈতিক থিম সং— যা গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ভাইরাল হয়ে যায়।

গানটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর প্রতীকগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলোকে এখন বাংলাদেশিরা প্রত্যাখ্যান করতে চায়— এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে। নৌকা হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতীক, যাকে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ধানের শীষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতীক। আর লাঙল হলো জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রতীক যে দলটি ১৯৮০-এর দশকে এক সামরিক শাসকের হাতে গড়ে ওঠে এবং একসময় আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক হলো দাঁড়িপাল্লা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচন ক্রমেই বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিচ্ছে। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে মাঠপর্যায়ের প্রচারণা শুরু হয়েছে। তবে অনলাইনে এই লড়াই চলছে মাসের পর মাস ধরে। রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করছে জেন-জি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে। যে তরুণ প্রজন্ম ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং যারা এবার সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।

জামায়াতপন্থী এই গানের অনলাইন জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যত এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে— কারা আগে ভাইরাল নির্বাচনী গান আনতে পারে। কারণ, এমন নির্বাচনী পরিবেশে গণসমাবেশ আর একমাত্র উপায় নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভোটারের কাছে পৌঁছানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

জামায়াতপন্থী গানটির সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী লন্ডনভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান আল বান্না আল জাজিরাকে জানান, গানটি শুরুতে ঢাকার একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন এটি শেয়ার করতে শুরু করেন, তখন অন্য প্রার্থীরাও বুঝতে পারেন এই গানটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারছে। এরপর তারাও এটি ব্যবহার শুরু করেন।’

এরপর বিএনপিও তাদের নিজস্ব নির্বাচনী গান প্রকাশ করে। গানটির কথায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়, বিএনপি দলগত স্বার্থের আগে দেশকে রাখে। গানের কথায় বলা হয়, ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ; ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।’

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও (এনসিপি) একটি গান প্রকাশ করে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। তবে ওই গান ছিল কেবল ডিজিটাল প্রচারণার একটি অংশ।

সংক্ষিপ্ত নাট্যরূপ ভিডিও, আবেগঘন ভোটার সাক্ষাৎকার, ব্যাখ্যামূলক কনটেন্ট ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ— সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের কনটেন্টের ঢল নেমেছে। এ বছর অনলাইন লড়াই শুধু সংসদ নির্বাচন ঘিরেই নয়।

১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা একই সঙ্গে একটি গণভোটেও সিদ্ধান্ত নেবেন— ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামে পরিচিত বেশ কিছু সংস্কারের অনুমোদন দেওয়া হবে কি না। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেগুলো স্থায়ী করতে এই গণভোট জরুরি।

কেন অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ।

ডেটারিপোর্টাল নামের একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল গবেষণা সংস্থার ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী, প্রায় ৫ কোটি ইউটিউব ব্যবহারকারী, ৯১ লাখ ৫০ হাজার ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছেন—যাদের বয়স ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে। তুলনামূলকভাবে এক্স (সাবেক টুইটার)-এর ব্যবহারকারী সংখ্যা মাত্র ১৭ লাখ ৯০ হাজার।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল ডিজিটাল উপস্থিতিই ব্যাখ্যা করে কেন রাজনৈতিক দলগুলো অনলাইন প্রচারণায় এত বেশি বিনিয়োগ করছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। এদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দেবেন, কিংবা শেখ হাসিনার শাসনামলে কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম, বিরোধী দল দমন ও বয়কটের অভিযোগ ওঠে, যা নির্বাচনগুলোকে কার্যত প্রহসনে পরিণত করেছিল। এই অভিজ্ঞতাই তরুণদের হতাশা থেকে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ রূপ দিয়েছে।

ডিজিটাল কৌশল

অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করেছে, যার ফলে তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণও করতে পারবে না। এর ফলে নির্বাচনটি কার্যত দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

একদিকে রয়েছে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট, যারা নিজেদের আওয়ামী লীগের শাসনের বিপরীতে একটি অভিজ্ঞ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গুম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি ১৯৯১–৯৬ ও ২০০১–০৬ মেয়াদে বাংলাদেশ শাসন করেছে। অন্যদিকে রয়েছে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট, যার অংশ এনসিপি।

বিএনপির নেতা মাহদি আমিন আল জাজিরাকে বলেন, দলটি অনলাইনে প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছে এবং ভোটারদের মতামত সংগ্রহের উপর জোর দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি পরীক্ষিত শাসকদল। প্রতিটি খাতেই আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।’

অনলাইন সম্পৃক্ততা বাড়াতে বিএনপি MatchMyPolicy.com–এর মতো ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে ভোটাররা দলের প্রস্তাবিত নীতির সঙ্গে একমত বা দ্বিমত জানাতে পারেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও janatarishtehar.org নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য আংশিকভাবে ভোটারদের মতামত সংগ্রহ করে নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করা।

জামায়াত নেতা জুবায়ের আহমেদ বলেন, তাদের অনলাইন প্রচারণার লক্ষ্য হলো ‘আমরা যে বর্ণনায় বিশ্বাস করি, সেটি তুলে ধরা’।

তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের দেখি, কিন্তু অনুসরণ করি না। আমাদের প্রতিযোগিতা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক।’

অনলাইনে কে এগিয়ে?

বিশ্লেষকেরা এখনই কোনো পক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করতে রাজি না। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুবাশ্বির হাসান বলেন, দুই পক্ষের ডিজিটাল কৌশলে ভিন্নতা স্পষ্ট।

তার মতে, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো ছোট ভিডিও ও গ্রাফিক কার্ডে উপস্থাপন করছে। যেমন—‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প, যার আওতায় ৫০ লাখ নারী ও পরিবারকে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ‘ফার্মার কার্ড’ প্রকল্পে কৃষকদের জন্য সার, বীজ, কীটনাশকের ন্যায্যমূল্য, সহজ ঋণ ও বিমার কথাও বলা হচ্ছে।

অন্যদিকে, জামায়াতপন্থী কনটেন্টের বড় অংশ বিএনপিকে আওয়ামী লীগের মতোই একটি দল হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যস্ত।

ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য ডিসেন্ট’–এর সম্পাদক কদরুউদ্দিন শিশির বলেন, জামায়াতঘনিষ্ঠ অনলাইন প্রচারণায় ভারতবিরোধী বার্তাও জায়গা পাচ্ছে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতে পালিয়ে যান এবং ভারত তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

কদরুদ্দিন শিশির বলেন, ‘এই বিষয়গুলো মিম ও অনুকরণমূলক কনটেন্টের মাধ্যমে জামায়াতের সমর্থক গণ্ডির বাইরেও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।’

গণভোটও ভাইরাল

এ বছর অনলাইন লড়াই শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর গণভোটকেও কেন্দ্র করে ঘুরছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আল জাজিরাকে বলেন, ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের প্রভাব কমে যাওয়ায় এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মূল গণমাধ্যমের ব্যবহার দিন দিন কমছে। সংস্কারগুলো স্থায়ী করতে জনসমর্থন পেতে অনলাইন প্রচারণা অপরিহার্য।’

এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নজরদারি জোরদার করা, নির্বাচন কারচুপি ঠেকানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে— যাতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপিও অনলাইনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।

তবে বিশ্লেষক ও কনটেন্ট নির্মাতারা একমত, মাঠপর্যায়ের প্রচারণার গুরুত্ব এখনো অটুট। হাসানা আল বান্না বলেন, ‘ভোটারদের কাছে পৌঁছানো ও প্রভাবের দিক থেকে সরাসরি প্রচারণার বিকল্প নেই।’

তার মতে, ‘তবে, মানুষ কী নিয়ে আলোচনা করবেন, সেই এজেন্ডা ঠিক করে দেয় অনলাইন প্রচারণা।’

বাংলাদেশের মতো তরুণ ভোটারপ্রধান দেশে সেটিই জয় ও পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।