নাহিদ-জামায়াতের ‘অস্থির’ জোট, পাল্টে দিতে পারে ভোটের সমীকরণ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় যিনি রাস্তায় স্লোগান দিয়ে জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছিলেন, সেই নাহিদ ইসলাম এখন ব্যালটের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ছাত্রনেতা থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধান—এমন দ্রুত উত্থানের পর এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি লড়ছেন এমন এক জোট নিয়ে, যা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা থামছেই না। তার গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) হাত মিলিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে—একটি সিদ্ধান্ত যা কারও কাছে কৌশল, আবার কারও কাছে আদর্শিক বিচ্যুতি।
নাহিদ ইসলাম প্রথম পরিচিত হন ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময়। সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সাদা শার্ট, মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা এক তরুণের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—সেই তরুণই নাহিদ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও অল্প সময় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেখান থেকে বেরিয়ে ২০২৫ সালে গঠন করেন এনসিপি, যার মূল লক্ষ্য ছিল ‘পুরোনো রাজনীতির বাইরে নতুন রাজনৈতিক পথ’ তৈরি করা।
কিন্তু নতুন দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সংগঠন ও মাঠপর্যায়ের শক্তি। সে জায়গাতেই আসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত। নাহিদের ভাষায়, এটি কেবল নির্বাচনী সমঝোতা—দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসনের মতো সাধারণ ইস্যুতে একসঙ্গে লড়াইয়ের কৌশল। তার যুক্তি, একা লড়লে এনসিপি ভোটের মাঠে টিকতে পারত না; জোট তাদের সংগঠন, কর্মী ও ভোটব্যাংকের সহায়তা দিচ্ছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এখানেই ঝুঁকি। জামায়াত একটি পুরোনো ও বিতর্কিত দল—বিশেষ করে নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু ইস্যুতে তাদের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে। ফলে নাহিদের নতুন ও উদারপন্থি ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। জোট ঘোষণার পর এনসিপির ভেতর থেকেও কিছু নেতার সরে দাঁড়ানোর ঘটনা সে আশঙ্কাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
সংখ্যার হিসেবে এই জোটে জামায়াত বড় অংশীদার। ৩০০ আসনের নির্বাচনে এনসিপি লড়ছে ৩০টিতে, আর জামায়াত ২০০-এর বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তবুও নাহিদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের স্মৃতি তাকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি নিজে লড়ছেন ঢাকা-১১ আসনে, যেখানে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এই জোটকে কেউ দেখছেন বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত হিসেবে—নতুন দলকে টিকিয়ে রাখার উপায়। আবার কেউ মনে করছেন, এতে এনসিপি নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাতে পারে। অর্থাৎ এটি এক ধরনের দ্বিমুখী তলোয়ার : জিতলে শক্তি বাড়বে, হারলে পরিচয় সংকট গভীর হবে।
সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলাম-জামায়াত জোট আসলে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের রাজনীতির একটি পরীক্ষা। এটি দেখাবে, আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব নির্বাচনী বাস্তবতায় কতটা টিকে থাকতে পারে এবং নতুন দলগুলো পুরোনো শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে নিজেদের পরিচয় ধরে রাখতে পারে কি না। এই নির্বাচনের ফল তাই শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, বরং নাহিদ ইসলাম নামের তরুণ নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তারও বড় ইঙ্গিত বহন করছে।
সূত্র: আলজাজিরা