রিজভীই হচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হওয়ায় দলটির সাংগঠনিক নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তার শূন্য পদে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে তার স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন—এ নিয়ে দলের ভেতরে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে রুহুল কবির রিজভীর নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির অতীত রীতিও রিজভীর পক্ষে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে দলের প্রথম যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার নজির রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রিজভীকে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং তার শূন্য পদে নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ২০-২১ আগস্টের মধ্যে সব চূড়ান্ত হয়ে যাবে। দলের চেয়ারম্যান বিষয়টি চূড়ান্ত করবেন। এখানে কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নেই।
দলের হাইকমান্ডের ওপর আস্থাশীল বলেও জানান তিনি।
রিজভীর এই বক্তব্যে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। যদিও দলীয়ভাবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
তৃণমূলের আস্থার জায়গায় রিজভী
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে রুহুল কবির রিজভীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাংগঠনিক যোগাযোগ। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছেন তিনি।
দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রিজভী। দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকের মতে, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর তৃণমূল পর্যন্ত তার যে বিস্তৃত যোগাযোগ রয়েছে, তা অন্য অনেক নেতার তুলনায় তাকে এগিয়ে রেখেছে।
দলের সংকটময় সময়েও রিজভীকে সামনে থেকে ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও দলীয় অবস্থান গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।
বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে রিজভীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যখন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই দ্বিধায় ছিলেন, তখন রিজভী নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
তার বলিষ্ঠ বক্তব্য ও সাংগঠনিক সক্রিয়তা বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীদেরও আন্দোলনে সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন দলের নেতারা।
বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—দলের তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয়তা এবং দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন রিজভী। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিভিন্ন সময়ে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
ফখরুলের পর রিজভীর সামনে বড় দায়িত্ব
২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০১৬ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। এরপর প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ছয়বার কারাবরণ করেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা। দীর্ঘ সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে তাকে পরিবর্তনের গুঞ্জন উঠলেও তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সজ্জন ভাবমূর্তি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে দলের জন্য তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।
তবে চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেই কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব পদে থাকছেন না—এমন ইঙ্গিত মির্জা ফখরুল নিজেই আগেই গণমাধ্যমকে দিয়েছিলেন।
এর মধ্যে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, ওই নির্বাচনে মির্জা ফখরুলকে দলীয় প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে তার দীর্ঘদিনের মহাসচিবের দায়িত্বও শেষ হবে।
কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা
বিএনপির অতীত ইতিহাস বলছে, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের পরবর্তী সময়ে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার নজির রয়েছে। রিজভীর ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতে পারে।
প্রথম ধাপে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এরপর জাতীয় কাউন্সিলে দলের নেতাকর্মীদের মতামত ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে।
তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব—দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রুহুল কবির রিজভী।
.png)




