logo

সার্বিয়ায় বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকরা যেসব দুর্দশার মুখে

সার্বিয়ায় বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকরা যেসব দুর্দশার মুখে
সার্বিয়ার একটি শহর। ছবি: ট্রাবেলমি ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

দ্রুত ভিসা ও সহজে প্রবেশের জন্য ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়া অনেকের পছন্দের তালিকায় আছে। দেশটিতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের অধিকাংশই নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ খাত এবং ফুড ডেলিভারির মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজে নিয়োজিত হন। এসব কাজের মধ্যে খাবার ও পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনও রয়েছে।

তবে এসব কাজের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা দিয়েছে। সার্বিয়ায় বর্তমানে অনেক বিদেশি শ্রমিককে ঋণের বোঝা, শোষণ ও অধিকারবঞ্চনার মুখে পড়তে হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্র্যান্টস।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে দেশটিতে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সার্বিয়ার অভিবাসী শ্রমিক ইউনিয়ন। এর মধ্যে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

চলতি বছরের জুনে সার্বিয়ার অভিবাসী শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের পেছনে দেশটিতে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের শ্রম অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার সংগঠিতভাবে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা থেকেই অভিবাসী শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নেয়।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সার্বিয়ায় অভিবাসনের সবচেয়ে প্রচলিত ধরন যে শ্রম অভিবাসন, তা শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনারের প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে। সংস্থাটি প্রতি বছর এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির শ্রমবাজারের চাহিদা এবং স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতির কারণে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সার্বিয়ায় কোন দেশের নাগরিকের সংখ্যা কত

গত বছরের শেষ নাগাদ সার্বিয়ায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে বসবাস করছিলেন ৬৪ হাজার ৬৭২ জন বিদেশি নাগরিক। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেশি।

বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন রাশিয়ার নাগরিক। তাদের সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার। এরপর রয়েছেন চীনের ১২ হাজার ৩০০, ভারতের ৭ হাজার, তুরস্কের ৬ হাজার এবং নেপালের ২ হাজার ৭০০ নাগরিক।

এ ছাড়া অন্যান্য দেশের ১৩ হাজারের বেশি নাগরিক সার্বিয়ায় কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে বসবাস করছিলেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, মিসর ও উজবেকিস্তানের নাগরিকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

সার্বিয়ায় বিদেশি নাগরিকদের অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার একমাত্র ভিত্তি কর্মসংস্থান নয়। শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম, পারিবারিক পুনর্মিলন, ধর্মীয় সেবা, চিকিৎসা কিংবা পরিচর্যার ভিত্তিতেও এই অনুমতি পেতে পারেন বিদেশিরা।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এসব বিভিন্ন ভিত্তিতে সার্বিয়ায় অস্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন রাশিয়ার নাগরিক, ৫৯ হাজার ৯১৭ জন। এরপর চীনের ১৫ হাজার ১৬০ জন।

এ ছাড়া ভারত, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তানের নাগরিকরাও এই তালিকায় রয়েছেন। অন্যদিকে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের মধ্যে রাশিয়ার নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

অভিবাসীবিরোধীর মুখে বাংলাদেশসহ অনেক রাষ্ট্র

সার্বিয়ার অভিবাসী শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া তারা রুকেচি মিলিভয়েভিচ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মাগলোচিস্তাককে বলেন, ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাশিয়া বা চীন থেকে আসা শ্রমিকদের তুলনায় তাদের সংখ্যা এখনও কম।

তিনি বলেন, কিন্তু এই সবচেয়ে ছোট অংশের অভিবাসীদের লক্ষ্য করেই ডানপন্থীরা অভিবাসীবিরোধী প্রচারণা চালায়। ক্রোয়েশিয়ায়ও একই ঘটনা ঘটছে। সেখানে ‘জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন’ এবং বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিকদের মাধ্যমে ‘শ্বেতাঙ্গ মানুষের’ অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ার দাবি তুলে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। অথচ অভিবাসী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং সার্বিয়া থেকে।

তিনি আরও বলেন, অশ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। তাদেরই সবচেয়ে বেশি শোষণ করা হয় এবং সবচেয়ে খারাপ পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়।

ঋণের বোঝা নিয়ে আসেন বিদেশি শ্রমিকরা

তারা রুকেচি মিলিভয়েভিচের মতে, সার্বিয়ায় বিদেশি শ্রমিকরা নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যার শুরু হয় তাদের নিজ দেশ থেকেই। বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক শ্রমিককে ঋণ নিতে বাধ্য করা হয়। গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর সুযোগ পেতেই তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।

রুকেচি বলেন, এর ফলে শ্রমিকরা ঋণ দাসত্বের মতো পরিস্থিতিতে পড়েন। তারা আশা করেন, প্রতিশ্রুত শর্ত অনুযায়ী দ্রুত কাজ করে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এরপর নিজেদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অর্থ উপার্জন চালিয়ে যেতে পারবেন।

সার্বিয়ায় পৌঁছানোর পর শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা নিজ দেশে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, সার্বিয়ায় যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তার কারণে বিদেশি শ্রমিকেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন না। কারণ, তারা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না, বলেন শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা।