logo

ভেনিসের বিলাসবহুল জাহাজ নির্মাণ কারখানায় শ্রমিক পরিবারের মিলনমেলা

ইসমাইল হোসেন স্বপনইতালি
ভেনিসের বিলাসবহুল জাহাজ নির্মাণ কারখানায় শ্রমিক পরিবারের মিলনমেলা
ইতালির জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ফিনকানতিয়েরি ভ্রমণে শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ইতালির অন্যতম বিখ্যাত জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ফিনকানতিয়েরি। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিপইয়ার্ড রয়েছে। এরমধ্যে ভেনিসের শিপইয়ার্ডটি অন্যতম। এখানে প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক ব্যস্ত থাকেন বিশাল আকারের বিলাসবহুল জাহাজ নির্মাণে। এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অভিবাসী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকও রয়েছেন।

ভেনিসের ফিনকানতিয়েরিতে তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজগুলো। বিশাল এসব জাহাজ ২০ থেকে ৩০ তলা পর্যন্ত উঁচু হয়। বাইরে থেকে দেখতে এগুলো যতটা আকর্ষণীয়, এর নির্মাণ প্রক্রিয়া তারচেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও পরিশ্রমসাধ্য।

জাহাজের প্রতিটি কাঠামো, প্রতিটি কক্ষ, প্রতিটি সংযোগস্থল তৈরির পেছনে রয়েছে অসংখ্য শ্রমিকের দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম। কারও হাতে ওয়েল্ডিং মেশিন, কেউ করছেন ফিটিং, কেউ আবার জাহাজের বিভিন্ন অংশের নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত। প্রতিদিনের এই কঠিন শ্রমের বিনিময়ে পরিবারের জন্য উপার্জন করেন তারা।

কিন্তু পরিবারের মানুষটি যে জায়গায় কাজ করেন, সেই কর্মস্থল সম্পর্কে পরিবারের অনেকেরই বাস্তব ধারণা থাকে না। একজন বাবা কিংবা স্বামী অথবা সন্তান প্রতিদিন সকালে কোথায় যান, কী পরিবেশে কাজ করেন, কতটা পরিশ্রম করতে হয়, এসব অনেক সময় পরিবারের কাছে অজানা থেকে যায়।

এই বাস্তবতাকে পরিবারের সামনে তুলে ধরতেই গত ২০ সেপ্টেম্বর, রবিবার, ফিনকানতিয়েরি কর্তৃপক্ষ আয়োজন করে বিশেষ এক পারিবারিক মিলনমেলা। এতে শ্রমিকদের পাশাপাশি অংশ নেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সুযোগ দেওয়া হয় শ্রমিকদের কর্মস্থল কাছ থেকে দেখার। বিশাল শিপইয়ার্ড, নির্মাণাধীন জাহাজ এবং সেখানে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ দেখে তারা বুঝতে পারেন, প্রতিদিনের উপার্জনের পেছনে কতটা শ্রম, ঝুকি ও দায়িত্ব জড়িয়ে রয়েছে।

মিলনমেলায় পরিবারের জন্য ছিলো বিশেষ বুফে খাবারের আয়োজন। শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা। কর্মস্থলের কঠিন পরিবেশের বাইরে এদিন শ্রমিক ও তাদের পরিবার কাটান আনন্দঘন কিছু সময়।

অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত ছিলেন আরআইসি একাডেমির পরিচালক ও আর্কিটেক্ট রিতু মিয়া। শ্রমিকদের অধিকার, তাদের কর্মপরিবেশ এবং পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়টিও এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন করে সামনে আসে।

আয়োজনটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল একজন পরিশ্রমী বাবা কিংবা স্বামীর কর্মজীবনের বাস্তবতা পরিবারের সদস্যদের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে শ্রমের প্রতি সম্মান এবং শ্রমিকের কাজের মর্যাদা সম্পর্কে পরিবারের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

তবে এতো বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এমন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নিরাপত্তাকে। বিশাল শিপইয়ার্ডে রয়েছে ভারী যন্ত্রপাতি, নির্মাণাধীন জাহাজ, উঁচু কাঠামো এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্য। ফলে শ্রমিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাও ছিলো কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান বিবেচনা।

ফিনকানতিয়েরির বিশাল জাহাজগুলো যখন একদিন সমুদ্রের বুকে যাত্রা করে, তখন সেগুলোর সৌন্দর্যই মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকে হাজারো শ্রমিকের শ্রম, ঘাম আর ভালোবাসার গল্প।

বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য এই শ্রম শুধু একটি চাকরি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ, দেশে থাকা স্বজনদের জন্য দায়িত্ব এবং নিজের জীবনে একটু স্বচ্ছলতা আনার চেষ্টা।

ফিনকানতিয়েরির এই পারিবারিক আয়োজন তাই শুধু একটি মিলনমেলা ছিল না। এটি ছিল শ্রমিকের কর্মজীবনকে পরিবারের কাছে তুলে ধরার একটি সুযোগ, যেখানে একটি বিলাসবহুল জাহাজের ঝলমলে বাইরের রূপের পাশাপাশি দৃশ্যমান হয়েছে তার পেছনে থাকা শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংগ্রামের গল্প।