জার্মানির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নাজেহাল অভিবাসীরা, গবেষণায় উঠে এল যত কারণ

জার্মানিতে অবস্থানরত অভিবাসী ও শরণার্থীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়ছেন। অনেকের পক্ষেই জার্মানির জটিল সরকারি স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার বিয়টি বোঝা কঠিন। কারণ দেশটির পরিষেবাগুলো ব্যবহার করাও খানিকটা জটিল।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক অভিবাসী ইউরোপের শিল্পোন্নত এই দেশটির স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খুঁজে পেতে সমস্যার মুখে পড়েছেন।
জার্মান ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ডিআইডব্লিউ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শরণার্থী ও অভিবাসীরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেতে বিশেষ করে তাদের নতুন পরিবেশে নতুন বাসস্থানে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে ভোগান্তির মুখে পড়েন।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া শরণার্থীদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তারা চিকিৎসা পেয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে ৪২ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সম্প্রতি জার্মানিতে আসা শরণার্থীদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বলেছেন, চিকিৎসার খরচের কারণে তারা সেবা নিতে চান না। বিশেষ করে যখন খরচ বিমার মাধ্যমে কভার করা হয় না।
১০ শতাংশ বলেছেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে এত বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাই একে তারা প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় জানা গেছে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে এক-তৃতীয়াংশের বেশি অভিবাসী বিভ্রান্ত। কাঠামোগত বাধার পাশাপাশি জার্মান স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থায় নেভিগেট করতে উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে।
প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শরণার্থী জানান, উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা খুঁজে পেতে তাদের অসুবিধা হয়। অনেকেই বলেছেন, জরুরি অবস্থা বা চিকিৎসা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বোঝা তাদের পক্ষে কঠিন।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়াদের ৩৭ শতাংশ জানিয়েছেন, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাসেবা অর্থাৎ প্রিভেনটিভ কেয়ার, স্ক্রিনিং সম্পর্কিত তথ্য বুঝতে তাদের অসুবিধা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য বোঝার ক্ষেত্রে ৩৯ শতাংশের অসুবিধা হয়।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ
গবেষণার লেখকদের মধ্যে অন্যতম লুইস বিডল বলেছেন, এই বাধাগুলো দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ‘শরণার্থীদের, বিশেষ করে তাদের আসার প্রথম কয়েক বছরে চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হয়। যদি এই সেবা পেতে দেরি হয়, তাহলে স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার জন্য বেশি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থায় অভিবাসী ও শরণার্থীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে গবেষণাপত্রে দুটি সুপারিশ করেছে—
প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত যোগাযোগ উন্নত করা, যার মধ্যে রয়েছে পেশাগতভাবে ভাষা অনুবাদ করা। মধ্য়স্থতার বিষয়টি সহজ করে প্রাঞ্জল ভাষায় আরও তথ্য দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, তারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত বাধা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন, যেমন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারণ এবং সেবা প্রবেশাধিকার।
গবেষণাটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালে করা হয়েছিল। সেখানে ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জার্মানিতে আসা প্রায় ১১ হাজার ২০০ জন শরণার্থী ও অভিবাসনীর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
অনিয়মিত অভিবাসীরা ইইউর স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার জটিলতা বোঝেন না
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের (ডব্লিউএইচএ) একটি গবেষণা বলছে, ইউরোপজুড়ে অনিয়মিত অভিবাসীরা জটিল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (জার্মানিসহ) বুঝতে অসহায় বোধ করেন।
এ ছাড়া এই অনিয়মিত অভিবাসীরা গবেষকদের জানিয়েছেন, তাদের অস্থায়ী বাসস্থানের বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার ভয়ে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।
গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা না করানোর ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ব্যাপক মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং জরুরি অবস্থার মতো পরিণতি হতে পারে।
মৌলিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারকে মানবাধিকারের একটি মূল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান এবং জাতিসংঘের ২০২৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন রিভিউ ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামো চুক্তি বিষয়টিকে সমর্থন করেছে।
সূত্র: ইনফোমাইগ্র্যান্টস
