থাইল্যান্ডের নদীতে পাখির বাসার আদলে নির্মিত হচ্ছে পথচারী সেতু

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের চাও ফ্রায়া নদীর ওপর পাখির বাসার আদলে একটি পথচারী সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটির সরকার।
ঐতিহাসিক সংওয়াত ও খলং সান এলাকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা এবং বহুমুখী গণপরিবহন সংযোগ জোরদার করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্টের নেতৃত্বে নেওয়া এ প্রকল্পে সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ বিলিয়ন বাথের বেশি, যা প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি টাকার সমপরিমাণ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন সেতুটি শুধু যাতায়াতের সুবিধা বাড়াবে না, বরং ব্যাংককের একটি নতুন নগর-ল্যান্ডমার্ক হিসেবেও গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে পথচারীবান্ধব অবকাঠামো তৈরি, টেকসই নগর চলাচল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং চাও ফ্রায়া নদীর দুই তীরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতেও ভূমিকা রাখবে এটি।
চাও ফ্রায়া নদী পারাপার দীর্ঘদিন ধরেই পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যমান সড়কসেতুগুলোতে মোটরযানের চাপ বেশি। অন্যদিকে, ফেরি চলাচলের সময়সীমাও সীমিত। ফলে নদী পার হতে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের অনেক সময় অনিরাপদ ও অসুবিধাজনক পথ বেছে নিতে হয়।
নতুন সেতুটি এই সমস্যার সমাধানে ব্যাংককের বহুমুখী ‘হুইল-রেল-রিভার’ বা ‘চাকা-রেল-নদী’ পরিবহন নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করবে।
ফ্রা নাখন এলাকার দিকে সেতুটি সংযুক্ত হবে সংওয়াত রোডের সাওয়াদ্দি পিয়ারের সঙ্গে। এর মাধ্যমে পথচারীরা সহজেই ইয়ারাওয়ারাত বা ব্যাংককের বিখ্যাত চায়নাটাউন এলাকায় যেতে পারবেন। একই সঙ্গে ওয়াত মাংকন স্টেশনের এমআরটি সিলভার লাইনের সঙ্গেও সংযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, চাও ফ্রায়ার থনবুরি তীরের খলং সান এলাকায় সেতুটি চিয়াং মাই রোডের সঙ্গে যুক্ত হবে। ভবিষ্যতে এটি নির্মাণাধীন এমআরটি সাউদার্ন পার্পল লাইনের (তাও পুন–রাত বুরানা সম্প্রসারণ) সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন করবে।
ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট বলেন, বড় সড়ক অবকাঠামোর পাশাপাশি নগর উন্নয়নে মানুষের চলাচলকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
তিনি বলেন, “আমি চাই শহরে এমন একটি ল্যান্ডমার্ক থাকুক। চাও ফ্রায়া নদীর ওপর এমন একটি সেতু, যা বিশেষভাবে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্য তৈরি হবে। গাড়ির জন্য ইতোমধ্যেই অনেক সেতু রয়েছে।”
তার মতে, নতুন এই সেতু আশপাশের এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ফ্রা নাখন ও থনবুরি এলাকার মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতেও ভূমিকা রাখবে।
বিএমএর গণপূর্ত বিভাগের কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, নতুন সেতুটির নদীর ওপর মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩০০ মিটার। এটি বিদ্যমান ফ্রা পোক ক্লাও ও ফ্রা চাও তাক সিন মহারাজ সেতুর মাঝামাঝি এলাকায় নির্মাণ করা হবে।
সেতুটির প্রস্থ হবে প্রায় ৭ থেকে ১০ মিটার। ফ্রা নাখন তীরে এটি সংওয়াত রোডের সাওয়াদ্দি পিয়ার থেকে শুরু হয়ে নদী পেরিয়ে খলং সানের চিয়াং মাই রোডে গিয়ে যুক্ত হবে। সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোসহ পুরো প্রকল্পের বিস্তৃতি হবে প্রায় ১ কিলোমিটার।
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন করে কোনো জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এর ফলে নদীতীরবর্তী পুরোনো আবাসিক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর উন্নয়নকাজের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে সংযোগকারী ভবনগুলোর ছাদ ব্যবহার করে কমিউনিটি শপ ও স্ট্রিট ফুডের দোকান স্থাপনের বিষয়টিও নকশায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
সেতুটির প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিস্তারিত নকশা ও অন্যান্য কারিগরি কাজের জন্য চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সার্ভিসেস সেন্টারকে ২৫ মিলিয়ন বাথের পরামর্শক চুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিস্তারিত নকশা ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। চূড়ান্ত বাজেট অনুমোদনের পর ২০২৮ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণ শেষে ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হলে সেতুটি শুধু সংওয়াত ও খলং সানের মধ্যে সরাসরি পথচারী ও সাইকেল সংযোগ তৈরি করবে না, বরং ব্যাংককের ঐতিহাসিক দুই তীরকে রেল, নদীপথ ও সাইকেলভিত্তিক পরিবহনের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


