মিশরে আজও মরদেহ দাফন করা হয় হাজার বছরের পুরোনো রীতিতে

মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানো ও মরদেহ দাফনের রীতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন। তবে শাফি মাজহাবের অনুসারীদের দেশ মিশরে আজও প্রচলিত রয়েছে এমন এক পারিবারিক সমাধি-প্রথা, যার সঙ্গে রয়েছে দেশটির হাজারো বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র। প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে মৃত্যুর পর মরদেহ সংরক্ষণের জন্য মমি করার প্রচলন ছিল।
সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী মরদের জন্য নির্মাণ করা হতো বিভিন্ন ধরনের সমাধি। ফেরাউন ও রাজপরিবারের সদস্যদের মরদেহ রাখা হতো পিরামিডে কিংবা লুক্সরে নীল নদের তীরবর্তী ‘ভ্যালি অব দ্য কিংস’ ও ‘ভ্যালি অব দ্য কুইন্স’-এ। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত হতো তুলনামূলকভাবে সাধারণ সমাধি।
প্রাচীন সেই সমাধি-সংস্কৃতির কিছু বৈশিষ্ট্য আধুনিক মিশরের কবরস্থানগুলোতেও দেখা যায়। রাজধানী কায়রোর বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে ‘সিটি অব দ্য ডেড’ বা ‘মৃতের শহর’। বিস্তীর্ণ এই এলাকায় রয়েছে অসংখ্য পারিবারিক কবরস্থান, মাকবারা ও সমাধি। অনেক পরিবারের কাছে এগুলো শুধু কবরস্থান নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত পারিবারিক সমাধিস্থল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কায়রোর ‘সিটি অব দ্য ডেড’-এ অবস্থিত বাংলাদেশি কবরস্থান পরিদর্শনের সুযোগ হয়। সেখানে একটি মিশরীয় পারিবারিক মাকবারা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে স্থানীয় এক তত্ত্বাবধায়ক সেটির ভেতরে নিয়ে যায় আমাদের।
বাইরে থেকে মাকবারাটিকে দেখলে মনে হবে ছোট একটি বাড়ি। প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মার্বেল পাথরে মোড়ানো ছোট একটি উঠান। উঠানের এক পাশে রয়েছে পাথরের পাটাতন দিয়ে ঢাকা একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষের প্রবেশপথ। পাথরের পাটাতন সরিয়ে কয়েক ধাপ নিচে নামতেই দেখা গেল একটি বড় কক্ষ। এর পাশেই রয়েছে দরজাবিহীন আরও দুটি কক্ষ। কক্ষগুলোর মেঝে সমতল বালিতে ঢাকা।
তত্ত্বাবধায়ক জানান, এটি একটি নতুন মাকবারা। এখনও এখানে কোনো মরদেহ দাফন করা হয়নি। ভবিষ্যতে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পর এসব ভূগর্ভস্থ কক্ষেই তাদের মরদেহ দাফন করা হবে। একটি কক্ষ নির্ধারিত পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জন্য; বাবা, দাদা ও অন্যান্য পুরুষ স্বজনদের জন্য। অন্য কক্ষটি থাকবে নারী সদস্যদের জন্য; মা, দাদি, চাচি ও অন্যান্য নারী স্বজনদের জন্য।
পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে দাফনের আগে মাকবারার প্রবেশপথের পাথরের পাটাতন সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ভূগর্ভস্থ কক্ষে জমে থাকা গ্যাস ও দুর্গন্ধ বের হয়ে যায়। এরপর কোনো একটি মসজিদে স্বজন, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে আসা হয় পারিবারিক মাকবারায়। ভূগর্ভস্থ কক্ষে সিঁড়ি দিয়ে মরদেহ নামিয়ে কেবলামুখী করে রাখা হয়। এরপর সবাই বেরিয়ে এলে প্রবেশপথের পাথরের পাটাতনটি আবার বসিয়ে সিমেন্ট ও বালু দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মরহুমের জন্য দোয়া শেষে স্বজনেরা ফিরে যান নিজ নিজ গন্তব্যে। তবে এখানেই শেষ নয়; মৃত্যুর পরও শুরু হয় প্রিয়জনকে স্মরণ ও তার জন্য প্রার্থনার আরেক অধ্যায়।
মৃত ব্যক্তির পরিবারের বাড়িতে সাধারণত তিন দিন শোক পালন করা হয়। স্থানীয়ভাবে এই শোকানুষ্ঠানকে বলা হয় ‘আজ্জা’। এ সময় মৃতের স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনেরা কবরস্থানে আসেন। সকাল ও বিকেলে তারা মাকবারায় গিয়ে দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং কিছু সময় আপনজনের কবরের পাশে কাটান।
হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরে আধুনিক নগরজীবনের মাঝেও টিকে রয়েছে এই পারিবারিক সমাধি-প্রথা। পিরামিড ও রাজাদের বিশাল সমাধি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের পারিবারিক মাকবারা; মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে স্মরণ, সম্মান ও তার জন্য প্রার্থনার এই ঐতিহ্য আজও মিশরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।




