logo

ইন্টারপোলের জালে বেনজীর, দেশে ফেরানোর কূটনৈতিক পথনকশা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজমধ্যপ্রাচ্য
ইন্টারপোলের জালে বেনজীর, দেশে ফেরানোর কূটনৈতিক পথনকশা
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অপরাধ দমন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দেশে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা বিচারাধীন।

বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে বদ্ধপরিকর। তবে এই উচ্চপ্রোফাইল প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কতটা মসৃণ হবে, তা নির্ভর করছে আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

কাউন্টডাউন শুরু: ৩০ দিনের সময়সীমা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এনসিবি আবুধাবি গত ১২ জুন বাংলাদেশের এনসিবি ঢাকাকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে জানানো হয়েছে, ইউএই-এর ফেডারেল ল নং ৩৯/২০০৬ (আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা আইন)-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন জানাতে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে আবেদন না পৌঁছালে আইনি জটিলতায় আসামি মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন। ফলে আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে ঢাকাকে উপযুক্ত আইনি নথিপত্র পাঠাতে হবে।

প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার দুটি তারিখ এখন আলোচনায়—১২ জুন, যেদিন এনসিবি আবুধাবি বেনজীরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। সে হিসেবে ১২ জুলাই কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময়।

দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না থাকলেও পথ খোলা

প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরাসরি কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় এই প্রক্রিয়া থমকে যাবে। কিন্তু আইনের পথ এখানে বন্ধ নয়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি ও দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি, যা অপরাধীদের তথ্য আদান-প্রদান ও বিচারিক সহযোগিতার একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪-এর ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী সরাসরি চুক্তি না থাকলেও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সরকার অপরাধী আদান-প্রদান করতে পারে।

‘দুবাই মিশন’ সফল করতে যা প্রয়োজন

আইনের শর্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই আইনি লড়াইয়ে সফল হতে হলে ঢাকাকে তিনটি মূল বিষয়ে জোর দিতে হবে।

প্রথমত, নিখুঁত নথিপত্র ও আরবি অনুবাদ। ইউএইর আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ আবেদনের প্রতিটি কাগজ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এফআইআর, চার্জশিট, দুর্নীতির প্রমাণাদি নিখুঁতভাবে আরবি ভাষায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সত্যায়িত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দ্বৈত অপরাধের নীতি প্রতিষ্ঠা। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ শুধু বাংলাদেশের আইনে নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনেও সমভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশকে।

তৃতীয়ত, মামলার অরাজনৈতিক চরিত্রের অকাট্য প্রমাণ। আন্তর্জাতিক আদালতে আসামিপক্ষ সাধারণত এ ধরনের মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করতে হবে, এই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং প্রচলিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ।

বেনজীর আহমেদের সফল প্রত্যর্পণ নির্ভর করছে মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর নিখুঁত আইনি নথিপত্র, তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা।

অতীত অভিজ্ঞতা যা আশা জাগাচ্ছে

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও অতীতে বাংলাদেশ অনেক পলাতক আসামিকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আশার আলো দেখাচ্ছে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকার ও মুহসীন মিয়াকে গত মে মাসে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ টিম তাদের সফলভাবে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনে

বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বিত আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই হাই-প্রোফাইল আসামিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। আগামী ৩০ দিনের কূটনৈতিক ও আইনি কৌশলের দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।