‘পৃথিবীর বুকে নিজের চিহ্ন রেখে যেতে চাই’, কাশ্মীরি কিশোর কাজমি

রাশিয়ার ইকাতেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ ২০২৬’। বিশ্বের ১৯১টি দেশ থেকে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ১০ হাজার যুব প্রতিনিধিদের পাশাপাশি এই ফেস্টিভ্যালে অংশ নিচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি শতাধিক দেশের এক হাজার শিশু ও কিশোর। তাদেরই একজন পাকিস্তান অধ্যুষিত কাশ্মীরের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সাঈদ আলী নাকি আজমি।
ইউরোপ ও রাশিয়ায় শিশুদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং ছবি প্রকাশে গণমাধ্যমকে অভিভাবকদের থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুমতি সাপেক্ষে পাকিস্তানের কাশ্মীরের কিশোর নাকি কাজমি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অংশ নেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন এশিয়া পোস্টের সেনজেন প্রতিনিধি শাওন সোলায়মান।
এশিয়া পোস্ট: এই ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলুন
নাকি কাজমি: এখানে কাশ্মীরি জনগণের প্রত্যাশা ও স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার আশপাশের মানুষদের অনুপ্রাণিত করতে চাই যেন আমরা একত্রে আমাদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে পারি।
এশিয়া পোস্ট: এই ফেস্টিভ্যাল সম্পর্কে জানলেন কীভাবে?
নাকি কাজমি: গত ফেব্রুয়ারিতে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করার সময় এই ইভেন্টের ব্যাপারে প্রথম জানতে পারি। এই বিষয়ে আরো জানার চেষ্টা করি এবং এই ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন ভাবলাম কেন নয়, আবেদন করে দেখি। আবেদনের শর্ত অনুযায়ী একটি প্রবন্ধ লিখি এবং ভিডিও রেকর্ড করে আয়োজকদের পাঠাই। এর কয়েক দিন পরেই কনফার্মেশন মেইল পাই।
এশিয়া পোস্ট: এখানে অংশগ্রহণের পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী?
নাকি কাজমি: আমার প্রথম অনুপ্রেরণা ছিল কাশ্মীরের বাইরে গিয়ে পৃথিবীটা দেখার। পাশাপাশি আমার ‘ভয়েস’ বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আমার মতো সব শিশু-কিশোরদের কিছু স্বপ্ন রয়েছে। এবং সেগুলো আমরা ভবিষ্যতে অর্জন করতে চাই। তারই একটা অনুশীলন হতে পারে ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়া। সেই ভাবনা থেকেই আবেদন করা।
এশিয়া পোস্ট: এখানে কী ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন?
নাকি কাজমি: আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ও প্রযুক্তি নিয়ে আমার আগ্রহ সবথেকে বেশি। সেজন্য আমি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সম্পর্কিত কার্যক্রমগুলোতে নিজেকে বেশি সম্পৃক্ত রেখেছি। যেমন আমি এখানকার রোবটিক্স সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ক্লাস ওয়ার্কশপ এবং সেমিনারে অংশ নিয়েছি। রোবটের মডেল তৈরি করা ও সেগুলোকে বাস্তবিকভাবে তৈরি করা করার বিষয়ে আমি এখানে শিখেছি এবং একটি ছোট রোবট বানিয়েছি। সাইন্স প্যাভিলিয়নে বর্তমান সময়ের নতুন নতুন প্রযুক্তিগত ডিভাইস এবং সমাধানগুলো জানার চেষ্টা করেছি। সেখানকার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। এভাবে আমি আমার বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান এবং মেথড বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।
এশিয়া পোস্ট: এখানে এসে প্রথম কোন জিনিসটি শিখেছেন?
নাকি আজমি: প্রোগ্রামিং নিয়ে আমার আগ্রহ আছে তবে আমি এ বিষয়ে তেমন দক্ষ না। বিশেষ করে ‘লজিক বেইজড প্রোগ্রামিং’ নিয়ে আমার কোন পূর্ব ধারণা ছিল না। তাই এখানে আসার পর প্রথম প্রোগ্রামিং নিয়েই কিছু কাজ করি। যদিও খুবই বেসিক লেভেলের প্রোগ্রামিং করা এখানে শিখেছি। এটি আমার জন্য একদমই নতুন অভিজ্ঞতা।
এশিয়া পোস্ট: এখানে কোন নতুন বন্ধু হলো?
নাকি কাজমি: অনেক, আমি এখানে অনেক বন্ধু পেয়েছি। বিশেষ করে রাশিয়ানরা খুবই আন্তরিক এবং অতিথি পরায়ণ। তাদের পাশাপাশি আমি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যেমন ইন্দোনেশিয়া জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও নাইজেরিয়া। সত্যি কথা বলতে এটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
এশিয়া পোস্ট: এখানকার কোন বিষয়গুলো সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরবেন?
নাকি কাজমি: অনেক অনেক মানুষের সঙ্গে অনেকগুলো সুখকর মুহূর্তের স্মৃতি দেশে নিয়ে যাব। পাশাপাশি এখানে যা শিখলাম, যে নতুন অভিজ্ঞতা আমার হলো, এগুলো আমার সঙ্গে থাকবে। এখানে আসার পর অনুধাবন করলাম যে, আমার সোশ্যাল স্পিকিং স্কিল বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দক্ষতাটিও আমার সঙ্গে আমার দেশে যাবে। আমার আন্তর্জাতিক বন্ধুরা আমাকে অনেক অনেক স্যুভেনির এবং উপহার দিয়েছে। সেগুলো আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আর এসব কিছু আমার দেশের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে বিনিময় করব।
এশিয়া পোস্ট: এই ফেস্টিভ্যাল স্বপ্ন পূরণের আয়োজন। সবাই স্বপ্নের কথা বলছে। আপনার স্বপ্ন কী?
নাকি কাজমি: আমার স্বপ্ন হচ্ছে এই পৃথিবীর বুকে আমার নিজের একটি চিহ্ন রেখে যাব। পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আমাকে যেন মানুষজন ভুলে না যায়। আমার মতে, কারো মৃত্যু হলেও তিনি ততক্ষণ মৃত নন যতক্ষণ পৃথিবীর অন্তত একজন মানুষ তাকে মনে রাখে। কিন্তু কাউকে যখন সেই একটি মানুষও ভুলে যায়, তখনই তার মৃত্যু হয়। রাশিয়ার ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়া আমার সেই স্বপ্ন অর্জনের প্রথম ধাপ বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতে তো আমি এ ধরনের আরও ইভেন্টে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে আমার ভয়েস এবং আমার কমিউনিটি কে আরো বড় পরিসরে তুলে ধরার প্রত্যাশা রাখি।
এশিয়া পোস্ট: এখানে আপনার অংশগ্রহণের মাধ্যমে আপনার দেশের কমিউনিটি কি কোনোভাবে উপকৃত হবে?
নাকি কাজমি: অবশ্যই। আমার দেশে আমার কমিউনিটিতে আমার আশেপাশে আমার মত যে শিশুরা রয়েছে তাদের সঙ্গে আমি রাশিয়ার এই অভিজ্ঞতা বিনিময় করব। এই ফেস্টিভ্যালের মাধ্যমে আমি যে নতুন সুযোগগুলো পেয়েছি যে নতুন বিষয়গুলো শিখেছি এগুলো আমি তাদের সামনে তুলে ধরব। তাদের জানাবো যে তারাও চাইলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনে অংশ মাধ্যমে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন।
এশিয়া পোস্ট: কাশ্মীরে আপনি যেখানে থাকেন সেই জায়গাটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
নাকি কাজমি: কাশ্মীরকে সঙ্গত কারণেই পৃথিবীর জান্নাত বলা হয়। কাশ্মীরের জেলাম উপত্যকা অঞ্চল থেকে আমি এসেছি যা খুবই সুন্দর। তবে সম্প্রতি সেখানে কিছু রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিগত ১০০ দিনের বেশি সময় যাবত সেখানে ইন্টারনেট নেই। কাশ্মীরকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তের উভয় পাশেই এটি হচ্ছে। তবে আমরা যেখানেই থাকি না কেন সেখানে শান্তি এবং প্রগতি অর্জিত হোক এটি আমার প্রত্যাশা।
এশিয়া পোস্ট: রাশিয়ায় আসার খবর জেনে আপনার অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
নাকি কাজমি: ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেয়ে সর্বপ্রথম সংবাদটি আমার বাবাকে জানাই। আমার মা বাসার বাইরে থাকায় তখনই তাকে জানাতে পারিনি। কিন্তু আমার বাবা জেনেও তার মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি ছিল যে, আমি কি আসলেই সুযোগ পেয়েছি। তবে আবার মা জানার পর তিনি বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবছিলেন আমাকে ইউক্রেনে অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে কিনা। তখন তাদেরকে বোঝাতে এবং তাদের সম্মতি পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল। যদিও আমরা সবাই একসঙ্গে বসে আগের বছরের অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করি তারপর আমার অভিভাবকরা আশ্বস্ত হন যে এই ইভেন্টে আমাকে পাঠাবেন। কিন্তু আমরা যেমন আশঙ্কা করেছিলাম তার কিছুই হয়নি। আয়োজকদের ধন্যবাদ যে তারা আমাদের যথাযথ যত্ন নিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: আপনার মতো যারা শিশু কিশোর রয়েছে তাদের জন্য আপনার বার্তা কি থাকবে?
নাকি আজমি: আমি বলব প্রথম পদক্ষেপটি নিন; পা ফেলুন। আপনি যদি প্রথম পদক্ষেপটি নিতে পারেন পরের গুলো সহজ হয়ে যায়। মনে হতে পারে যে আমি এখানে আসতে পেরেছি বলে এমনটা বলছি। কিন্তু এটাই সত্যি। আপনি নিজে যখন প্রথম উদ্যোগটি নিবেন তারপর আপনিও আমার সঙ্গে একমত হবেন।



