logo

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার ৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল মিশর

আফছার হোসাইন
আফছার হোসাইনমিশর
ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার ৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল মিশর
ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া ৬ বাংলাদেশি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্বপ্ন ছিল ইউরোপে পৌঁছে জীবনের মোড় ঘোরানোর। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় নেমেছিলেন ছয় বাংলাদেশি। কিন্তু ছোট একটি রাবারের নৌযানে উত্তাল সমুদ্রে দিক হারিয়ে তাদের সেই স্বপ্ন পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে।

শেষ পর্যন্ত ‘THEMIS’ নামের একটি ফরাসি বাণিজ্যিক জাহাজের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান তারা। ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারের পর মিশরের দমইয়ত সিকিউরিটি সেন্টারে আটক থাকা ছয় বাংলাদেশিকে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সহায়তা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশে ফেরানো হয়েছে।

দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ছয় বাংলাদেশি পৃথকভাবে লিবিয়ায় যান। পরে মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের প্রলোভনে ইউরোপে যাওয়ার আশায় তারা একত্রিত হন।

গত ২ আগস্ট বাংলাদেশি, সুদানি, ইথিওপীয় ও মিশরীয় নাগরিকসহ মোট ৩৮ জন লিবিয়ার তব্রুক এলাকা থেকে রাবারের নৌযানে করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। কিন্তু নৌযানটিতে পর্যাপ্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একপর্যায়ে তারা ভূমধ্যসাগরে দিক হারিয়ে ফেলেন। সীমিত সক্ষমতার ওই নৌযানে দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকায় চরম ঝুঁকিতে পড়ে তাদের জীবন।

পরে ফরাসি বাণিজ্যিক জাহাজ ‘THEMIS’ তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। প্রায় দুই দিন সমুদ্রপথে যাত্রা শেষে উদ্ধারকৃতদের মিশরের দমইয়ত বন্দরে নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাদের দমইয়ত সিকিউরিটি সেন্টারে রাখা হয়।

বিষয়টি জানতে পেরে ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল দমইয়ত সিকিউরিটি সেন্টার পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিরা আটক বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেন।

এরপর শুরু হয় দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া। দূতাবাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক সমন্বয়ের ফলে ছয় বাংলাদেশির দেশে ফেরার বিমান টিকিটের ব্যয় বহনে সম্মত হয় মিশরীয় কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২২ সেপ্টেম্বর তিনজন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আরও তিনজন বাংলাদেশি মিশর থেকে নিরাপদে দেশে ফেরেন।

কয়েক দিন আগে জাগো নিউজে ‘লিবিয়ার গেম ঘর থেকে মিশরের জেলখানায় ৬ বাংলাদেশি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর মিশরে আটক ছয় বাংলাদেশির পরিবার জানতে পারেন, তাদের স্বজনরা জীবিত আছেন।

নরসিংদীর রায়পুরের লক্ষ্মীপুর গ্রামের ফয়সাল মাহমুদের বাবা সিরাজুল ইসলাম ছেলে ফিরে পাওয়ায় জাগো নিউজ ও বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আপনাদের কাছ থেকে ছেলের অনেক তথ্য পেয়েছি। এমনকি দেশে ফেরার সময় ও টিকিটের নম্বরও হোয়াটসঅ্যাপে পেয়েছি। মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আমার ছেলে দ্রুত দেশে ফিরতে পেরেছে। আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া।

ছেলের জন্য এলাকার মানুষের দোয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার ছেলের জন্য গ্রামের মানুষ অনেক কান্নাকাটি করেছে, দোয়া করেছে। দেশ-বিদেশের অনেক মানুষও তার জন্য দোয়া করেছেন। সবার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

সমুদ্রযাত্রার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বোর্ডের পানি দেখলেই আমার ছেলে এখনো আতঙ্কিত হয়ে যায়। এত কষ্টের মধ্যে কখনো কখনো তার মনে হয়েছে, ঘুমের মধ্যেই যেন আল্লাহ তাকে নিয়ে নেন। এখন তাকে সুস্থভাবে ফিরে পেয়েছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।

অন্যদিকে, নরসিংদীর বেলাব এলাকার আবদুল্লাহ মাইমুরের বাবা শাহাব উদ্দিনও ছেলেকে ফিরে পেয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, সাগরপথ থেকে আল্লাহ আমাদের সন্তানদের আবার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের সবাই খুশি। মানুষের দোয়া ও আল্লাহর রহমতেই তারা বেঁচে ফিরেছে। আল্লাহর কাছে আমরা হাজার শুকরিয়া আদায় করি।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছোট ও অনুপযোগী রাবারের নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দালাল বা মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেক বাংলাদেশি বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন বিপজ্জনক যাত্রায় বের হন। মাঝসমুদ্রে নৌযান বিকল হওয়া, দিক হারানো, খাদ্য-পানির সংকট এবং প্রাণহানির আশঙ্কা এ ধরনের যাত্রায় অত্যন্ত বেশি।

একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন যেন কারও জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে না দাঁড়ায়—এজন্য লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দালালচক্রের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার এবং অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।