সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান ডাকসু ভিপির

গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা প্রত্যাখান ও বর্জন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক একাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে তিনি এ ঘোষণা দেন।
পোস্টে সাদিক কায়েম লেখেন, জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিতব্য ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র মতবিনিময় সভায় ডাকসু ভিপি হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি এবং ডাকসু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী এই প্রহসনের মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান করছি এবং বর্জন করছি।
তিনি লেখেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহস্রাধিক শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিলো রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার, নামমাত্র কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। সংবিধান সংশোধন আর সংস্কার এক বিষয় নয়। সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতাবলে সংসদ বিদ্যমান সংবিধান ও এর মৌলিক কাঠামোর বাইরে কিছু করতে পারবে না। সংসদ সংবিধানের বাইরে গিয়ে নিজের ক্ষমতায় নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
তিনি আরও লেখেন, ইতিহাসই প্রমাণ করে সংশোধনী ক্ষমতা কতটা সীমিত। জিয়াউর রহমানের সময় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হলেও ২০০৫ সালে হাইকোর্ট ও ২০১০ সালে আপিল বিভাগ সংশোধনীটি অবৈধ ঘোষণা করে। একইভাবে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ছয়টি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চের বিধানও ১৯৮৯ সালে বাতিল হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও আদালতের মাধ্যমে ২০১১ সালে বাতিল হয়েছিল।
সাদিক কায়েম লেখেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব রয়েছে। এসবের মধ্যে কয়েকটি প্রস্তাব সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে সরাসরি স্পর্শ করে। ফলে শুধু ১৪২ অনুচ্ছেদের সংশোধনী দিয়ে এসব বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের গুরুতর ঝুঁকি থাকবে। জেনেশুনে জুলাই সনদকে এমন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছে উল্লেখ করে ডাকসু ভিপি লেখেন, জুলাইয়ের সংস্কার আকাঙ্ক্ষা এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজন আইনগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত গাঠনিক সংস্কারপ্রক্রিয়া। অথচ সংস্কারকে কেবল সংসদীয় সংশোধনীতে সীমাবদ্ধ করার অবস্থান সেই বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাকেই সংকুচিত করছে। যে প্রক্রিয়ায় জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কারগুলো ভবিষ্যতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, সেটিকে টেকসই সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা জাতির সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা এবং নির্বাচন পূর্ববর্তী ওয়াদার বরখেলাপ।
সবশেষে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে সাদিক কায়েম লেখেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ এর আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে দেশের ৬৮.৫৯ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে গণরায় প্রদান করেছেন। এমন সুস্পষ্ট গণরায় থাকা সত্ত্বেও সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রহসনমূলক উদ্যোগে আমি এবং ডাকসু সম্পৃক্ত থাকব না। রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন বাদ দিয়ে ৬৯ শতাংশ মানুষের গণরায় মেনে জুলাই সনদের আলোকে অবিলম্বে স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছি।


