খুলনায় ১০০ দিনে ২৪ খুন
• হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ
• ছিনতাই ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধেও ঘটছে প্রাণহানি
• চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে নিহত অন্তত ৭৫ জন

খুলনা মহানগর ও জেলায় ১০০ দিনে অন্তত ২৪ জন খুন হয়েছেন। গত ২৭ জুলাই থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তারা। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের।
নিহতের তালিকায় এক নারী ও এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি সংশ্লিষ্ট পাঁচজন খুন হয়েছেন। এ ছাড়া ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর’ পাঁচ সদস্য নিহতের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭৫ জন।
খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতির সিংহেরচর এলাকায় আলম মেম্বারের ঘাট থেকে গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মাথায় রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেলা ১১টার দিকে নদীতীরে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে ভাটার কারণে নদীর পানি কমে গেলে আরও একটি মরদেহ দেখতে পান তারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে রূপসা থানা পুলিশ।
ওই দুজনের মধ্যে একজন মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫)। তিনি রূপসা উপজেলার রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে। পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। অপরজনের নাম রেজাউল করিম (৩০)। পুলিশের দাবি, তিনি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ বি-কোম্পানির সদস্য ছিলেন। রূপসা থানার ওসি মাসুম খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধের দিকটি মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।
এর আগের দিন রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহল এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে।
নগরীর নিরালা এলাকায় গত শনিবার শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার বিরুদ্ধে সাতটি মাদক ও একটি হত্যা মামলা ছিল।
গৃহবধূ খুশিকে (২৫) গত ২২ অক্টোবর কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে নগরীর লবণচরার জিন্নাহ পাড়ার বউবাজারের সাত নম্বর গলির মুখে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
গত ১০০ দিনে নিহত ২৪ জনের মধ্যে ১১ জন শুধু গুলিতে মারা গেছেন। আরও তিনজনকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ গুলির শিকার মোট ১৪ জন। এ ছাড়া চারজনকে কুপিয়ে, চারজনকে পিটিয়ে ও একজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজের চার দিন পর গত ২৬ আগস্ট দৌলতপুরের একটি বিল থেকে মনিরুল ইসলাম রনি নামের এক অটোরিকশা চালকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গত ২২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাতজন। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন পাঁচজন।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট পাঁচ নেতাকর্মী গত ১০০ দিনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সবশেষ গত রোববার নিহত হন তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির।
রূপসার নৈহাটিতে একটি ইটভাটায় ১১ অক্টোবর যুবদলকর্মী ফখরুল শেখকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিএনপিকর্মী আক্তার ঢালীকে তার বাড়ির সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় ৫ অক্টোবর। এর ১৫ দিন আগে আক্তার ঢালীর ছেলেকে জয় ঢালীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় পৃথক ঘটনায় গত ২৪ ও ২৭ অক্টোবর যুবদলের তিন নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। দৌলতপুরের কল্পতরু মার্কেটে গত ১৬ মার্চ নগর ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিকুল আনামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি মেসে চুরির অভিযোগে মারধরের পর ছাদ থেকে পড়ে নিহত হন ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন (২৩)। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতের এ ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গত ১০০ দিনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ বি-কোম্পানির সদস্য চারজন। তারা হলেন জয় ঢালী, মামুন মীর, মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) ও রেজাউল করিম ওরফে আলামিন (৩০)। শেষ দুজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ ২ নভেম্বর রূপসার আঠারোবেকি নদী থেকে উদ্ধার হয়।
মামুন মীর ১৮ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩২ দিন চিকিৎসার পর ২১ সেপ্টেম্বর মারা যান। অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ পলাশ গ্রুপের সদস্য তুষারকে ২২ অক্টোবর হত্যা করা হয়। নগরীর পূর্ব বানিয়াখামারে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।
গত ১০০ দিনের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন অন্তত আটজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইকবাল মোল্লা, যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস, যুবদলের নেতা সোহেল শেখ ও যুবদলের সাবেক নেতা ওহিদুল ইসলাম বাদল।
গুলিবিদ্ধদের মধ্যে দৌলতপুরের মহিদুল ইসলাম, আশিকুজ্জামান জনি, টুটপাড়ার ধনঞ্জয় কুণ্ডু এবং সিগারেট কোম্পানির বিক্রয়কর্মী সালমান আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
গোয়েন্দা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ ও সিরিজ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্তত নয়টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর নাম বারবার সামনে এসেছে। এর একটি রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’র নেতৃত্বাধীন শীর্ষ অপরাধী চক্র বি-কোম্পানি।
খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকাজুড়ে বি-কোম্পানির প্রভাব রয়েছে। মূলত মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির জের ধরে এলাকায় খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ে এই গোষ্ঠীর সদস্যরা।
পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম বাহিনী, টেনকি শাওন বাহিনী, আরমান বাহিনী, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপের মতো অন্তত আরও আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিনিয়ত মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে তারা।
চলতি বছর খুলনা থেকে মোট ৭৬টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মহানগর থেকে উদ্ধার করা হয় ৫০টি। আর জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে ২৬টি।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, খুলনায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে আরও অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এগুলো উদ্ধারে যৌথ বাহিনী অভিযান চললেও গোলাগুলি ও প্রাণহানি থামছে না।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে সংঘটিত ৭৫ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩৭ জনই খুন হয়েছেন নগরীতে। আর খুলনা জেলায় নিহত হয়েছেন ৩৮ জন। এই হিসাবে গত ১০ মাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে শেষ ১০০ দিনে। বেশির ভাগ হত্যার পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ সামনে এসেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. রেজাউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার পর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন পর অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগীরা মামলা ও তথ্য দিয়ে ঠিকমতো সহযোগিতা না করায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
