logo
Advertisement

কেন থমকে গেল প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

• দিল্লি সফরের এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা চলছিল

• বাদ সাধে ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার ভাষণ

• সফরের অনুকূল পরিবেশ দেখছে না ঢাকা

• সফরের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি

কেন থমকে গেল প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর
তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন রূপ পেতে যাচ্ছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে এ নিয়ে যোগাযোগও চলছিল। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সফর হতে পারে, এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল দুই দেশের গণমাধ্যমে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরির শর্ত জুড়ে দিয়েছে ঢাকা।

Advertisement

কেন থমকে গেল সফরের প্রস্তুতি

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সফরের সময়সূচি, বৈঠকের বিষয় এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সম্ভাব্য এজেন্ডা নিয়েও প্রস্তুতি এগোচ্ছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম ১৬ আগস্ট জানান, শেখ হাসিনার ওই প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢাকার এই অবস্থান নয়াদিল্লিকে জানানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ’আমি সব সময় সফরের সমর্থন করি। কারও সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির দিকে গেলে সফরের একটা ভূমিকা আছে ওইটাকে ভালো করার জন্য। কিন্তু তার আগে এটা নিয়ে প্রস্তুতিমূলক নেগোসিয়েশন করতে হয়। এগুলোর অগ্রগতি হলেই সফর হতে পারে।’

ঢাকার স্পষ্ট বার্তা

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরটি শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর হিসেবে নয় বরং এর আগে কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে অগ্রগতি দেখতে চাইছে ঢাকা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে বিশেষভাবে দুটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা।

শেখ হাসিনা ইস্যু বড় বাধা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বিচারিক ইস্যু।

গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এরপর থেকেই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বিচারিক বিষয়ে ভারতের মাটিতে কোনো ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এ কারণেই সফরের আগে বিষয়টির একটি সমাধান বা অন্তত দৃশ্যমান অগ্রগতি চাচ্ছে বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. মোহাম্মদ আশিক রহমান বলেন, 'শেখ হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে দুই দেশেই রাজনীতি করছে। সরকার আসলেই ফেরাতে চাইবে কি না, সেটাও ভাববার বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনা ফিরলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা হতে পারে সেটাও মাথায় রাখবে বিএনপি সরকার।’

তবে শেখ হাসিনা ফেরত আসলে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাকিব আলী বলেন, ‘অস্থিতিশীলতার কথা বলে আমরা কি ন্যায়বিচার থেকে পিছিয়ে যাব? বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যদি আবার ঝামেলা করতে চায়, বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্ররা রেডি আছে, প্রয়োজনে আবার নামবে তারা।’

হাদি হত্যা মামলাও যুক্ত হলো সমীকরণে

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাওয়ার বিষয়টিও এখন ঢাকা-দিল্লি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে, ওই মামলার আসামিদের বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সুযোগ করে দিতে। এ বিষয়ে ভারতের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। ফলে বিষয়টি দ্রুত সমাধান হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সফরের আগে কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ

সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ থেমে নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির কয়েক ঘণ্টা পরই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ’বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দ্রুত হওয়া উচিত। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

ড. আশিক রহমানের মতে, দুই নেতার বৈঠক হলেও এক সফরে সব সমস্যার সমাধান হবে না, তবে সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে।

দীনেশ ত্রিবেদী গত ১৮ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বলেন, ’ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে নয়াদিল্লি সফরে গেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’

তবে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করলে তাকে বড় সংবর্ধনা দেওয়া হবে, ভারতীয় হাইকমিশনারের এমন বক্তব্যে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ‘অভ্যর্থনা আসলে প্রোটোকলের ব্যাপার। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পানি, সীমান্ত চুক্তি, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ। অন্যথায় বড় অভ্যর্থনা দিয়ে আমার কী হবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার ফেরতের বিষয়টি ভারতীয় আদালতের কাছে পাঠানো আসলে সময়ক্ষেপণের কৌশল।’

দিল্লির আমন্ত্রণ, ঢাকার শর্ত

ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বেশ আগেই। তবে ঢাকার দেওয়া শর্তে আটকে গেছে সম্ভাব্য সফর। ঢাকা বলছে, সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। আর সেই পরিবেশ তৈরির সঙ্গে প্রত্যর্পণ ও বিচারসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের বল এখন অনেকটাই ভারতের কোর্টে।

দিল্লির জন্যও সহজ নয় পরিস্থিতি

ভারতের দিক থেকেও বিষয়টি সরল নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইনি ও কূটনৈতিক নানা বিষয় জড়িয়ে আছে। ফলে ঢাকার প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দিল্লির জন্য কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাতিল নয়, আপাতত অনিশ্চিত

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের বক্তব্যে মূলত ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সফরের পথ আবারও খুলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কখন সেই পরিবেশ তৈরি হবে, তা নির্ভর করছে ভারত কত দ্রুত বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়ে সাড়া দেয় তার ওপর। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ ও হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়ে ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ড. আশিক রহমান বলেন, 'সফরে বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে চাইবে। সীমান্ত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, তিস্তা, পানিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সুসম্পর্ক থাকা যৌক্তিক এবং সরকার তা বোঝে। তবে এ সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে।’

সামনে কী হতে পারে

কূটনীতিকরা বলছেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির পর এখন নজর থাকবে নয়াদিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ভারত যদি ঢাকার উদ্বেগগুলো নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেয়, তাহলে স্থবির হয়ে যাওয়া সফর প্রস্তুতি আবারও গতি পেতে পারে।’

সাকিব আলীর মতে, ‘শেখ হাসিনা যত দিন ধরে দিল্লিতে থাকবেন, তত দিন ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে ভারত কাজ করে যাবে আর আমরা ওইটাকে ছাড় দেব, তাহলে এটা কখনোই সত্যিকারের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন টেকসই সম্পর্ক হবে না। টেকসই সম্পর্ক যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের দুজনকেই অত্যন্ত ফ্র্যাঙ্ক এবং ক্যান্ডিড আলাপ করতে হবে, দুজনেরই দুজনের স্বার্থ দেখতে হবে। একপক্ষের স্বার্থ দেখে, একপক্ষের স্বার্থ দেখে কখনও সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় না।’