আড়াই বছরের প্রকল্প সম্পন্ন হয়নি ৮ বছরেও, ছোট পরিসরে শেষ করার উদ্যোগ
• সমীক্ষা ছাড়াই নেওয়া হয় দুই হাজার সৌর পাম্পের পরিকল্পনা
• বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৫০ পাম্পে
• ৬৫০ পাম্পের ২৮০টিতেই মেলেনি গ্রিড সংযোগ

৪০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে অনুমোদন পায় সৌর সেচ প্রকল্প। তবে আট বছরেও শেষ হয়নি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) এই প্রজেক্টের কাজ। এর মধ্যে আনা হয় একাধিক সংশোধনী। তাতেও লাভ না হওয়ায় এখন ছোট পরিসরে প্রকল্প শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পরিকল্পনা কমিশনে বসছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। সংশোধনীতে মূল পরিকল্পনার ২ হাজার সৌর সেচ পাম্প কমিয়ে আনা হচ্ছে মাত্র ৬৫০টিতে। বরাদ্দ থেকে বাদ যাচ্ছে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা।
২০১৮ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় আড়াই বছর। অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাপবিবো।

বারবার মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। আট বছর পর চলতি বছরের জুনে সংকুচিত পরিসরে প্রকল্পটি গুটিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চার দফা মেয়াদ বৃদ্ধি
প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ ২ বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় সংশোধনীতে আরও ২ বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দ্বিতীয় সংশোধনীর পর আরও দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ বছর, পরে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আরও ৬ মাস।
শুধু মেয়াদ নয়, বেড়েছে ব্যয়ও। দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় ৪০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৫৯৪ কোটি টাকা। তবে প্রধান কার্যক্রমগুলোর অধিকাংশ বাদ দিয়ে তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় কমিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ থেকে বাদ যাচ্ছে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা।
এই সংশোধনীতে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে বরাদ্দ কমিয়ে ৫৩ কোটি টাকা এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্প ঋণ কমিয়ে ২৯৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বাপবিবোর নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ কমিয়ে ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা কমেছে তিন ভাগের এক ভাগ
মাঠপর্যায়ে কাজের ব্যর্থতার কারণে প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমগুলো এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রথমে বিভিন্ন সক্ষমতার ২ হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প বসানোর কথা ছিল।
প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনীতে মাত্র ৬৫০টি পাম্প বসানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে স্থাপিত পাম্পগুলোর উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য ২ হাজার গ্রিড টাইড ইনভার্টার ও সংযোগ লাইন স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেটিও কমিয়ে ৬৫০টি করা হয়েছে।

অনুমোদিত মূল ডিপিপিতে ২ হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে মোট ১৯ দশমিক ৩ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার পিভি প্যানেল স্থাপনের সংস্থান ছিল। তবে ১৯তম প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে স্থাপিত পাম্পগুলোর গ্রিড ইন্টিগ্রেশন কাজ শেষ করে প্রকল্প সমাপ্ত করার লক্ষ্যে তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে ৬৫০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে মোট ৬ দশমিক ২৭ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার পিভি প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে
পুরো প্রকল্পে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও প্রতিটি পাম্পের একক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তৃতীয় সংশোধনীর ব্যয় বিভাজন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূল প্রকল্পে প্রতিটি পাম্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনীতে তা ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৩১ হাজার টাকায়। পাম্পের গ্রিড ইন্টিগ্রেশনের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের গড় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। তৃতীয় সংশোধনীতে এটি ৮২ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৪১ হাজার টাকায়।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়েছে সংশোধনী প্রস্তাবে। প্রকল্পের প্রথম অনুমোদনের সময় ১ ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে এটি ১০৮ টাকা এবং প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনীতে ১২২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, লক্ষ্যমাত্রা এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার পরও একক পাম্পের পেছনে এমন বিপুল ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্পের সঠিক প্রাক্কলন ও ক্রয়ের অস্বচ্ছতার প্রমাণ।
সমীক্ষা ছাড়াই পরিকল্পনা
প্রকল্পের ব্যর্থতা ও দীর্ঘসূত্রতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টি। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) কারিগরি সহায়তায় প্রাথমিক যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ দায়সারা ও অনুমানভিত্তিক।
সমীক্ষার সময় মাঠপর্যায়ের প্রকৃত সাইট সিলেকশন করা হয়নি। গ্রাহকদের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি বা উপযোগিতাও যাচাই করা হয়নি। মাঠের বাস্তব অবস্থা না জেনে কেবল অনুমানের ভিত্তিতে ২ হাজার পাম্পের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
মাঠপর্যায়ে সৌর পাম্প গ্রহণের জন্য ৫ হাজার ১৪২ জন কৃষক প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখালেও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব ও জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত আবেদন করেন মাত্র ২ হাজার ৭৫৯ জন। এর মধ্যে উপজেলা সেচ কমিটি মাত্র ১ হাজার ২৯৮ জনকে ছাড়পত্র দেয়।
ছাড়পত্র না পাওয়ার প্রধান কারণ ছিল, সরকারি নীতি অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী চলমান গভীর বা অগভীর সেচ পাম্প থেকে সুনির্দিষ্ট দূরত্বের শর্ত পূরণ না হওয়া। যথাযথ ভৌগোলিক সমীক্ষা না করায় অর্ধেকের বেশি আবেদনকারী শুরুতেই বাদ পড়েন।
মূল কাজের বাইরে বিশেষায়িত দায়িত্ব
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মূল কাজ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করা। সেখানে তাদের পরিধির বাইরে গিয়ে সেচ অবকাঠামো ও কৃষি ব্যবস্থাপনার মতো একটি বিশেষায়িত কাজ হাতে নেওয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ধরনের বিশেষায়িত কৃষিসংশ্লিষ্ট কাজ সাধারণত বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) করে থাকে। কৃষি খাতের সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার মাধ্যমে এই কাজ না করিয়ে বাপবিবোকে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে চরম সমন্বয়হীনতা এবং ধীরগতি তৈরি হয়।
ঝুলে আছে অধিকাংশ পাম্পের গ্রিড সংযোগ
প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে মাত্র ৬৫০টি করা হলেও সেটিও সময়মতো অর্জন করতে পারেনি বাপবিবো। নথিপত্র অনুযায়ী, ৬৫০টি পাম্পের ভৌত স্থাপন কাজ প্রায় শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৭০টি পাম্পের গ্রিড ইন্টিগ্রেশন অর্থাৎ সংযোগ লাইন ও নেট-মিটারিং সংযোগের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
বাকি ২৮০ পাম্পের গ্রিড সংযোগের কাজ এখনও বাকি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং কাজের ধীরগতির কারণে এই সংযোগ সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এডিবির ঋণ চুক্তির মেয়াদ আগামী জুনের পর আর বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাকি ২৮০টি পাম্পের নেট-মিটারিং কাজ শেষ করতে না পারলে এডিবি এই অংশের অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে।
পরিকল্পনা কমিশনের অবস্থান
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এই প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পর্যালোচনার পর বেশ কিছু সুপারিশ দিতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপযুক্ত ও বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ব্যতীত এবং মাঠের প্রকৃত সাইট ও গ্রাহকদের সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রতিশ্রুতি ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করার সুপারিশ থাকবে কমিশনের পক্ষ থেকে।
এর পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিয়মিত কাজের পরিধির বাইরে কোনো বিশেষায়িত প্রকল্প গ্রহণ পরিহারের সুপারিশ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের এমন বেহাল দশার জন্য যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করাকে দুষছেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বাপবিবোর নিয়মিত কাজের বাইরে গিয়ে এমন একটি বিশেষায়িত কাজ হাতে নেওয়াকে একটি বড় ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে।


