logo
Advertisement

রাজধানীর রহমতুল্লাহ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভুয়া ভাউচারে লুটপাট

রাজধানীর রহমতুল্লাহ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভুয়া ভাউচারে লুটপাট
রহমতুল্লাহ মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজধানীর লালবাগের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রহমতুল্লাহ মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি ও পারিবারিক আখড়ায় পরিণত করেছিলেন অধ্যক্ষ নাসরীন আকতার। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর বিক্ষোভের মুখে ১৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি আবার আগের পদে ফিরে এসে একই কর্মকাণ্ড শুরু করার অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

২০২৪ সালেই কলেজটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নির্দেশে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে তার বিরুদ্ধে। কমিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ৪৯ লাখ ৪ হাজার ১৯৩ টাকার আর্থিক অনিয়মের হিসাব উঠে আসে।

নাসরীন আকতার ও তার সহযোগীরা কাজ না করেই ভুয়া ভাউচার প্রদর্শন করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পরে তদন্ত কমিটির সুপারিশে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে চলমান রয়েছে।

স্কুল-কলেজ শাখায় ভুয়া খরচ

অভ্যন্তরীণ অডিটের তথ্য অনুযায়ী, নাসরীন আকতার এই কয়েক বছরে ম্যানেজিং কমিটি গঠন বাবদ ৫ লাখ ১ হাজার টাকা খরচ দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ফি, ডায়েরি ও বোর্ড অফিস খরচ এবং বিবিধ খরচের ভুয়া বিল দেখান তিনি। যেগুলোর কোনো অনুমোদিত তালিকা ও বৈধ নথিপত্র নেই। স্কুল শাখার অর্ধবার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, আপ্যায়ন ও বিবিধ কাজের নাম করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, বাস্তবে এসব কাজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

কলেজ শাখার নির্বাচনী পরীক্ষার আপ্যায়ন, উপহারসামগ্রী ক্রয় ও ভুয়া মূল্যায়ন কমিটির নামে পরীক্ষা তহবিল থেকেও ১ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এ ছাড়া

কলেজের উন্নয়নকাজ, শিক্ষকদের গাড়ি ভাড়া ও অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত যাতায়াত খরচের নামেও অবৈধভাবে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১০০ টাকা তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ডিআইজি ও অন্যদের ভুয়া গাড়ি ভাড়ার অবাস্তব খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ট্যাক্স কমানোর তদবিরের নামে টাকা আত্মসাৎ

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিটি করপোরেশনের ট্যাক্স কমানোর তদবিরের নাম করে বিভিন্ন তারিখে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন নাসরীন আকতার। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্যাক্স কমাতে তদবির করতে কোনো টাকা খরচ করা লাগে না। বাস্তবে ট্যাক্স কমানোর কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি এবং সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিটি ক্লাস পরিচালনা, পার্টটাইম শিক্ষক নিয়োগ ও কম্পিউটার মেরামতের নামেও ৬ লাখ ৮০ হাজার ২৫০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কম্পিউটারের পার্টস কেনার নামেও একাধিক ভুয়া বিল তুলে নেন তিনি।

ফেসবুক পেজের খরচ

রহমতুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফেসবুক পেজ পরিচালনার নামেও খরচ দেখানো হয়েছে। কোনো প্রকার যাচাই ছাড়াই ২৯ হাজার টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে এই খাতে। যদিও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজ ভবনের রঙের কাজ ও সংস্কার না করেই ভুয়া ভাউচার বানিয়ে মোট ৪ লাখ ৭২ হাজার ৪৬০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

পিকনিক ছাড়াই খরচের ভাউচার

কলেজ-শিক্ষকদের পিকনিক এবং পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান ও পিকনিকের ভুয়া ভাউচার বানিয়েও মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে নাসরীন আকতারের বিরুদ্ধে। যদিও শিক্ষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে এ ধরনের কোনো পিকনিকই অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানের অবাস্তব বাজেট তৈরি করে ৬ লাখ ১৭ হাজার ১২০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে কোনো অনুষ্ঠান না করেই ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯০ টাকা উত্তোলন এবং ২০২৪ সালে মাত্র ২০০ শিক্ষার্থীর খাবারের আয়োজন করে ২ হাজার ৬৪২ জনের খাবারের বিলের ভাউচার দেখান এই অধ্যক্ষ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন শিক্ষক এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিদ্যালয়ের টাকায় কখনোই কোনো পিকনিক আয়োজন করা হয়নি। যা হয়েছিল, সেগুলোর জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়েছিল। সুতরাং এমন খরচের কোনো সুযোগ নেই।

তদন্ত কমিটি জানায়, অধ্যক্ষ নাসরীন আকতার গ্যাস লাইনের অপ্রয়োজনীয় সংযোগ, শাখা অনুমোদন, এমপিও বোর্ড ফি, প্রধান শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও বাদ্যযন্ত্র তৈরির বিল, সাবেক সভাপতি ও অধ্যক্ষের এসি কেনার ব্যক্তিগত যাতায়াত খরচ, নিয়মবহির্ভূত ক্যাব ভাড়া ও যাতায়াত খরচ, আওয়ামীপন্থী স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের ব্যানার তৈরি, বিবিধ অফিস খরচ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার জন্য অ্যাপ্রোন ক্রয়, কম্পিউটার ল্যাব পরিচালনার কাল্পনিক পারিশ্রমিকসহ বিভিন্ন ভুয়া খাত দেখিয়ে এবং ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।

শুধু তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অডিটে গ্যালন ক্রয়, নুডলস বিল, নজরুল পত্রিকা বিল, ক্যাফে জোন বিল, কোয়ালিফিশন সেন্ট বোতাম বিল, বানপারী ক্লাব বিল, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদকের বিল, শীতকালীন অবকাশ ও দুর্গাপূজার ছুটির সময় অতিরিক্ত কাজের ভুয়া পারিশ্রমিকসহ ৪০ দিনের কাল্পনিক ছুটির পারিশ্রমিকের নামে বিভিন্ন ধাপে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়জুড়ে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

অধ্যক্ষ নাসরীন আকতার কলেজটিকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম ভেঙে তিনি তার নিজের ভাই ও বোনসহ সাতজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত করেছেন। তার বোন মারুফা ইয়াসমিন বকুলকে মাধ্যমিক শাখার ইন-চার্জ এবং বোনের স্বামী আব্দুল আজিজকে কলেজের ইন-চার্জ পদে নিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানের কোয়ার্টারে অবৈধ আবাসিক সুবিধা দিয়েছেন।

এ ছাড়া ভাগ্নি আঁখি আকতারকে বিধিবহির্ভূতভাবে অ্যাডহক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া আত্মীয় তানজিল হোসেনকে অ্যাডহক শিক্ষক, মো. শাহীদ তালুকদারকে অফিস সহকারী, নিজের বোন কল্পনা আকতার ও ছোট ভাই মো. জুয়েলকে ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

যৌন হয়রানিকারীকে পদোন্নতি

অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে নাসরীন আকতারের নৈতিক স্খলন ও অপরাধের পক্ষে অবস্থানের তথ্যও উঠে এসেছে। বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক প্রভাস চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়। কিন্তু নাসরীন আকতার সেই তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব করে প্রভাস চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো তাকে পদোন্নতি দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য বানান।

অদৃশ্য ক্ষমতায় পুনর্বহাল

২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন নাসরীন আকতার। তবে প্রায় দেড় বছর পর এত সব গুরুতর অভিযোগ ও মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তাকে পুনরায় অধ্যক্ষ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। ফলে পুনরায় অধ্যক্ষ পদে যোগ দিয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলা শিক্ষকদের হুমকি দেওয়া শুরু করেন তিনি। অভিযোগ আছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও মাউশির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপস করে তিনি তার পদে ফিরেছেন।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন। নাসরীন আকতারের ব্যাপারে কোনো কথা বললে স্কুলে ঢুকতে পারবেন না, এমন আশঙ্কার কথাও জানান তারা।

শিক্ষকরা বলেন, তার ব্যাপারে আমরা নয় বরং কাগজ কথা বলবে। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুষ দিয়েছেন, এমন দাবি করে পর্যন্ত টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেগুলোর ভাউচারও বানিয়ে দিয়েছেন।

তারা বলেন, নামকরা একটি প্রতিষ্ঠান, অথচ পড়াশোনার পরিবেশ তিনি নষ্ট করে দিয়েছেন। এসব দেখলে খুব খারাপ লাগে। ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস করে না। যেভাবে খুশি সেভাবে করেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।

ইতোমধ্যেই তার পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ আবুল কাশেম। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল তিনি আবেদন করেন।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে নাসরীন আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তবে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তার পক্ষ হয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতারা এই প্রতিবেদককে কল দিয়ে সংবাদ না প্রকাশের জন্য অনুরোধ জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কলেজ প্রশাসন শাখার সহকারী পরিচালক (বেসরকারী কলেজ) মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, তার দুর্নীতির বিষয়ে কোনো লিখিত তথ্য আমাদের কাছে নেই। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।