হাম-ডেঙ্গুর থাবায় বিপর্যস্ত হাজারও পরিবার, হাসপাতালে শয্যা সংকট

হাম ও ডেঙ্গুর যৌথ থাবায় রাজধানীতে বিপর্যস্ত হাজারও পরিবার। একই পরিবারের একাধিক সদস্যও আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হাম নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো। রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
মিরপুরের ছোট ইলেকট্রিক পার্টস ব্যবসায়ী মোবারক হোসেনের চার সন্তান গত এক সপ্তাহে হামে আক্রান্ত হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাদের ঠিকানা এখন রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাম হাসপাতাল।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় তলায় দেখা যায়, ৮ বছরের আব্দুর রহমানের হাতে ক্যানোলা, মুখে অক্সিজেন। পাশের বিছানায় স্যালাইন চলছে ৬ বছরের আহমদের। তাদের পাশের বেডে ক্যানোলা পরা অবস্থায় কাতরাচ্ছে ৪ বছরের আয়েশা। বাবা মোবারক হোসেন তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। পাশের শয্যায় সারা গায়ে র্যাশ নিয়ে শুয়ে আছে ছোট সন্তান, ২ বছরের আনাস।

মোবারক হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একে একে চার বাচ্চাই হামে আক্রান্ত হলো। এখানে চিকিৎসা খারাপ না। কিন্তু ডাক্তার ডেকে সব সময় পাওয়া যায় না। সকালে একবার এসে দুজনকে দেখে গেছে। এখন ডাকতে গিয়েছি, পাই না। কিছুক্ষণ পর এসে একজনকে দেখেছে। এখনও আমার এক সন্তানকে সারাদিনে কেউ দেখেনি। বেসরকারি হাসপাতাল হলে কিছু বলতে পারতাম। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় এখানে আমাদের কিছু বলারও নেই।’
আলাদা হাসপাতালে মা ও দুই সন্তান
সাভারের হেমায়েতপুর থেকে দুই ও পাঁচ বছর বয়সি দুই সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন রাজচন্দ্র। দুই সন্তান গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দুই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকলেও তাদের পাশে নিকটাত্মীয় কেউ নেই। কারণ শিশুদের মা শিখা রানীও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সাভারের অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সরেজমিনে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকালে হাসপাতালের হাম ও ডেঙ্গুর আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, চার বছরের শিশু নিরব কাতরাচ্ছে। পাশে বসে আছেন গ্রাম থেকে আসা স্বজন অরিত্রি রানী।

অরিত্রি রানী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাচ্চা দুইটা এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ওদের মায়েরও ডেঙ্গু হয়েছে, তার শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ। সাভারের হেমায়েতপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। থাকার মতো কেউ নেই। আমি সম্পর্কে দিদি হই। আমরা গ্রাম থেকে কয়েকজন এসে ওদের সঙ্গে থাকছি।’
আইসিইউতে সন্তান, মায়ের মৃত্যুতেও যেতে পারলেন না নিল কুমার
১১ বছরের মাথায় প্রথম সন্তানের বাবা হয়েছেন কেরানীগঞ্জের নিল কুমার। ৮ মাস বয়সি সেই সন্তান ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিন ধরে আইসিইউতে ভর্তি। এর মধ্যেই মৃত্যু হয় নিল কুমারের মায়ের। কিন্তু সন্তানকে আইসিইউতে ফেলে মায়ের সৎকারেও যেতে পারেননি তিনি।
হাসপাতালে থাকা স্বজনরা বলছেন, নাতির শারীরিক অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েন নিল কুমারের মা। তাদের ধারণা, ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নাতির শোকেই পরপারে পাড়ি জমান তিনি।
আগারগাঁও শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিচতলায় হাম ও ডেঙ্গুর ডেডিকেটেড ওয়ার্ডের বিছানায় ৮ মাস বয়সি শিশু নিত্যকে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন মা। পাশে নিল কুমার।

তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘১১ বছর পর সন্তানের বাবা হয়েছি। দুদিন জ্বর হলে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডাক্তার দেখাই। সেখানে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। হঠাৎ করে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করি। আমার মা নাতির চিন্তায় কান্নাকাটি করতে করতে গত রোববার মৃত্যুবরণ করে। সন্ধ্যায় এই খবর পাই। কিন্তু সন্তানকে এভাবে ফেলে মায়ের শেষবারের মতো মায়ের মুখ দেখতে যেতে পারিনি।’
হামের মধ্যেই ডেঙ্গুর থাবা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৯৬৩ শিশু। হামের তীব্রতার মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু নিয়ে ৯৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয় দুজনের।
এ নিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮৬। মৃত্যু হয়েছে ৯০ জনের। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে নজীর আহমেদ মনে করেন, হামের প্রকোপ কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যর্থতা।
ডা. বে নজীর আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটার সূচনা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। কিন্তু এই সরকার এসেও এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যেত। কিন্তু টিকার কাভারেজ সঠিকভাবে না হওয়ায় এটা এখন চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এটা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হতে যাচ্ছে কি না।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দুই লাখের ওপর রোগী, ৯০০-এর ওপর মৃত্যু। এখন সরকার একটি উদ্যোগ নিয়েছে, আবার টিকা দেবে। এটা খুব ভালোভাবে প্ল্যান করে না করলে আবারও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ এভাবে মহামারির মতো ছড়িয়ে যাবে, এটা মানা কঠিন। এ ছাড়া এখন ডেঙ্গুর সিজন চলছে। মে মাস পর্যন্ত একটা স্বস্তিদায়ক অবস্থা ছিল। জুন থেকে এটি বাড়তে থাকে। বৃষ্টি কমে গেছে। এখনই মশার বংশবিস্তার যে কোনোভাবে রোধ করতে হবে, না হলে ডেঙ্গু আরও ভয়ংকর রূপে আসতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হাম এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি এটা ঠিক। এখন আবার নতুন করে টিকা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। যারা টিকার কাভারেজের বাইরে রয়েছে তাদের খুঁজে খুঁজে টিকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’



