পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি নেতাদের চাঁদাবাজি

১৮ জুলাই দুপুর ১২টা। হেঁটে যাচ্ছেন কয়েকজন মানুষ। ১২টা ৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে তারা একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে গিয়ে ভেতরে কর্তব্যরত নির্মাণশ্রমিকদের গালমন্দ করতে থাকেন। এ সময় পুলিশের দুজন সদস্যও তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
সিসিটিভির ফুটেজে শোনা যায়, চাঁদা না দিলে উপস্থিত ব্যক্তিরা নির্মাণশ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ার জন্য বলছেন। চলে না গেলে শ্রমিকদের শাসাতে থাকেন। এরপর কাজ বন্ধ রাখতে বলে তারা সেখান থেকে চলে যান।
সিসিটিভির সেই ফুটেজের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকাটি মিরপুরের রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া এলাকার ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে। সেখানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তের একটি নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানে নির্মাণকাজ চলছে। ডেফোডিল হোমস লিমিটেড নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানি এই নির্মাণকাজের দায়িত্বে আছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন, তারা বিএনপি, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী। পরে আরও খোঁজ নিলে তাদের বিস্তারিত পরিচয় মেলে। সেই দলে ছিলেন ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জামাল ওরফে লম্বা জামাল, রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী শিহাব উদ্দিন, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মামুন, বিএনপি নেতা দুলাল ও আব্দুল হক।
এই চক্রের সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন দুজন পুলিশ সদস্য রূপনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রমজান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুরের রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া এলাকার ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে প্রায় ৩০ একর জমি ৫/৭২-৭৩ এলএ কেসের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। সেসব জমিতে ৪৭৪টি প্লট তৈরি করে বিক্রি করে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু নিজেদের অধিগ্রহণ করা জমি দখলে নিতে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি। ফলে প্লট বিক্রি করেও ক্রেতাদের জমির দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি।
২০০৯ ও ২০১৯ সালে দুই দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এর পর থেকেই স্থানীয় ভূমিদস্যুদের সঙ্গে একধরনের চোর-পুলিশ খেলা চলে আসছে। দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে প্লট বরাদ্দ পাওয়া মালিকরা জমি বুঝে পাচ্ছেন না। বিগত সরকারের সময় এসব জমির দখল স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার অনুসারীদের হাতে ছিল বলে জানা যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দখলদারিতেও বদল ঘটে। পুরোনো দখলদাররা এলাকা ছেড়ে গেলেও এখনো এসব প্লট দখলমুক্ত হয়নি। নতুন একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ এসব দখলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে এসব প্লটকে কেন্দ্র করে ফের শুরু হয়েছে চাঁদাবাজির মচ্ছব। এ ছাড়া কেউ প্লট বিক্রির পাশাপাশি ভবন নির্মাণ করতে চাইলেও একটি গোষ্ঠীকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। আবার চাহিদামাফিক চাঁদার টাকা না দিলে দিনদুপুরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তের এসব প্লট দখলের উৎসব চলছে। আর এসব প্লটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। নানা স্তরের প্রভাবশালীরা এসব জমি দখল ও চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ রূপনগর থানায় এক ডজনেরও বেশি সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায়নি। বারবার অভিযোগ দিলেও থানা পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।
জানা গেছে, ভবনে হামলার পর ডেফোডিল হোমস লিমিটেডের এমডি আবদুল মান্নান একাধিকবার রূপনগর থানায় গিয়ে আইনি সহায়তা চান। এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এমনকি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো পুলিশসহ এসে সন্ত্রাসীরা তার নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। পরে তিনি আদালতে একটি মামলা করেন, যার সিআর নম্বর-৫৮৭/২৬।
জানতে চাইলে ডেফোডিল হোমস লিমিটেডের এমডি আবদুল মান্নান বলেন, ‘চাঁদাবাজ শিহাব উদ্দিন, জামাল, শিপু মোল্লা, মামুন, দুলালসহ বেশ কয়েকবার আমাদের নির্মাণাধীন প্রজেক্টে বেশ কয়েকবার হামলা করে। তারা আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। আমি বেশ কয়েকবার রূপনগর থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলেছি, জিডি করেছি, লিখিত অভিযোগ দিয়েছি কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। উল্টো পুলিশ সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তারা আমার কাজ বন্ধ করে দিছে। পরে আমি আদালতে মামলা করেছি।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কাঙ্ক্ষিত চাঁদার টাকা না দেওয়ায় গত ৬ আগস্ট গভীর রাতে দুয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের খ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৩৫/১ প্লটে চুরির ঘটনা ঘটে। প্লটের চারদিকে বাউন্ডারি দেওয়া ১৩০ পিস টিন চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই প্লটের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. আশ্রাফ আলী রূপনগর থানায় একটি অভিযোগ দেন। তবে এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।
গত ৭ আগস্ট রাতে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ওই প্লটের কয়েকজন অংশীদার চোরকে শনাক্ত করে আটক করেন। পরে রূপনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তারেকুজ্জামানকে ফোন করে পুলিশ পাঠাতে বলেন ভুক্তভোগীরা। তারেকুজ্জামান তখন সুনির্দিষ্ট প্লট নম্বরসহ ঠিকানা দিতে বলেন। শেষে ঠিকানা দিলে পুলিশ আসার পরিবর্তে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের লোকজন এসে চোরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
এ নিয়ে পরে প্লটের একজন অংশীদার রূপনগর থানার পরিদর্শক অপারেশন তারেকুজ্জামানের কাছে অসহযোগিতা পাওয়ায় তার মুঠোফোন নম্বরে একটি খুদেবার্তা পাঠান। সেটিও এই প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়েছেন ভুক্তভোগী।
বার্তায় ভুক্তভোগী লেখেন, ‘ভাই, কাজটা ভালো করেননি। পুলিশ পাঠানোর আগে আপনি বারবার আমাকে লোকেশন জিজ্ঞেস করছেন। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছে যে, আপনার পুলিশ যাওয়ার আগে আসামিপক্ষের লোক আসামির কাছে আসবে এবং আসামি পালিয়ে যাবে। সেটাই হয়েছে। আপনি আমাকে এসআই ইব্রাহিমের নম্বর দিয়ে বলছেন, সে রওনা দিয়েছে, আসছে। আমি ইব্রাহিমকে ফোন দিয়েছি। সে বলছে, “আমি যাব না, রবিউল যাবে। আপনাকে রবিউলের নাম্বার দিচ্ছি।” এখন পর্যন্ত সে আমাকে রবিউলের নম্বর দেয়নি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘এসআই ইব্রাহিমকে বারবার ফোন দিয়েছি, সে আমার ফোন ধরে না। আপনি আমাকে রবিউলের নাম্বার দিতে চেয়েছেন, সেটাও দেননি। ঠিক আছে, আপনার আসামি ধরা লাগবে না। তবে আপনি যে তাদের সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করেন, সেই তথ্য-প্রমাণও আমার কাছে আছে। তবে আপনি যেটা করেছেন, সেটা ভালো করেননি। আপনি আসামির ঠিকানা বারবার আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, যাতে করে তাকে ওখান থেকে সরিয়ে দিতে পারেন, এটাই প্রমাণ করলেন।’
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক তারেকুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অসহযোগিতার অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা। তারেকুজ্জামান আরও বলেন, ওইদিন তিনি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। সঙ্গে পরিদর্শক তদন্ত ও থানার ফোর্স ছিল। একটি লিখিত অভিযোগের তদন্তের জন্যই সেখানে গিয়েছিলেন। তদন্তের আড়ালে চাঁদাবাজিতে সহযোগিতার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন – পুলিশ কেন চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে? এটি শতভাগ মিথ্যা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিহ্নিত এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন সাধারণ ডায়েরি করেছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এসব জিডি ও অভিযোগে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের নামের তালিকাসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য বিবরণী দেওয়া আছে।
গত ৯ জুন রূপনগর থানায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের করা একটি অভিযোগে ১৫ জনের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানেও ওই নেতাকর্মীদের নাম দেখা গেছে। তারা হলেন—রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, সাবেক ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আমজাদ হোসেন মোল্লা, ভাষানটেক থানা যুবদল নেতা পরিচয়দানকারী জাকির হোসেন শান্ত, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী মো. সিয়াব উদ্দিন, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম নজু, মোবারক হোসেন মেম্বার, দুলাল, খোকনের গ্যারেজের কর্মী মো. আক্তার হোসেন, হুমায়ুন কবির স্বপন, আইজল, গালিব হোসেন আরিফ, মো. রাজু (চান্দ্রি রাজু), সুমন, মো. সোহেলসহ আরও ২০ থেকে ২৫ জন।
এ ছাড়া কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ থেকে আরও কয়েকজনকে চিহ্নিত করেছে এশিয়া পোস্ট। তারা হলেন—৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি জামাল ওরফে লম্বা জামাল, রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী শিহাব উদ্দিন, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মামুন, বিএনপি নেতা দুলাল ও আব্দুল হক রূপনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ও এএসআই রমজান।
চাঁদাবাজিতে সহযোগিতা করার বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই রমজান এশিয়া পোস্টকে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই এবং এই অভিযোগ সঠিক নয়। সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি দেখা গেছে জানানো হলেও তিনি অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
এছাড়া এসআই আসাদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। মোবাইল ফোনে তিনি এশিয়া পোস্টের কাছে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন। সিসিটিভি ফুটেজে নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে তার দাবি, কীভাবে ফুটেজে তার উপস্থিতি রয়েছে সেটি জানেন না।
রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত। দৃঢ়ভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তার বা তার পরিবারের বিরুদ্ধে কেউ যদি দশ টাকা চাঁদাবাজির প্রমাণ দিতে পারে তাহলে এই এলাকায় আর থাকবেন না।
সিসিটিভির ফুটেজে তার উপস্থিতির বিষয়ে মামুন বলেন, এলাকার বাসিন্দা হিসেবে কোনো রাস্তায় চলাফেরা করতেই পারেন। কোনো ফুটেজে উপস্থিতি দেখা যাওয়া মানে এই নয় তিনি সেখানে চাঁদাবাজি করতে গিয়েছেন।
অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে বারবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠানো হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি এশিয়া পোস্ট। বাকি অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে বারবার ফোন দিয়ে ও মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া পায়নি এশিয়া পোস্ট।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুরের রূপনগর থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এম আশরাফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই অভিযোগ সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। তবে এর আগে সিপিবির সিনিয়র নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স এরকম একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন। আমি সাথে সাথে গিয়ে সেটি সমাধান করে দিয়েছি। এরপরও যদি কেউ বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কোথাও চাঁদাবাজি বা বেআইনি কিছু করে আমাকে সঙ্গে জানাবেন। উপযুক্ত প্রমাণ পেলে অবশ্যই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি যদি আমি নিজেও হই, তাহলে আমার দলকে জানাবেন, যেন শাস্তি নিশ্চিত হয়।



