৮ হাজার টাকার সম্মানি এক লাফে ১৫ হাজার টাকা
• সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভার সম্মানী বেড়েছে ৮৭.৫ শতাংশ
• জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে সম্মানী বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
• সভার সম্মানী সাধারণ মানুষের মাসিক মাথাপিছু আয়ের প্রায় দ্বিগুণ

দেশের সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বোর্ড সদস্যদের সভার সম্মানি প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি সভায় যোগ দেওয়ার জন্য বোর্ডের সদস্যদের সম্মানি ৮ হাজার টাকা থেকে এক ধাক্কায় ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বোর্ড সদস্যদের সভার সম্মানি বেড়েছে আগের থেকে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আর এই সম্মানি বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) সর্বশেষ বোর্ড সভায় সম্মানি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত ১১৭তম বোর্ড সভায় সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ও সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শেখ রবিউল আলম।
সভায় সেতু বিভাগের সচিব ও বিবিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এই সম্মানির হার অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হার আর উপযুক্ত নয় বলে তিনি দাবি করেন। তার এই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের সম্মানি বাড়িয়ে নিয়েছেন সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভার সদস্যরা।
সভার সম্মানি বাড়ানোর পক্ষে কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবে বলা হয়, এর আগে বোর্ড সদস্যরা প্রতি সভার জন্য ৮ হাজার টাকা সম্মানি পেয়ে আসছিলেন। ২০১৮ সালের পর থেকে বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোতে বোর্ড সভার সম্মানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিকেও এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এটিকে অমর্যাদাকর, স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বোর্ড সভায় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সদস্য-সচিব আবদুর রউফ জানান, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্যরা কর্তৃপক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়াদি অনুমোদন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। সার্বিক পর্যালোচনায় বর্তমান সম্মানির হার সময়োপযোগী না হওয়ায় এবং দায়িত্বের গুরুত্ব ও অন্যান্য সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার লক্ষ্যে বিদ্যমান সম্মানির হার বৃদ্ধির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
এ বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ. কে. এম শাহাবুদ্দিন বলেন, বিবিএর বোর্ড সভার সম্মানি সমজাতীয় অন্যান্য সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন; আইডিসিওএল, সেজিস, আইআইএফসি এবং আইডব্লিউএম-এর বোর্ড সদস্যদের সম্মানির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বিস্তারিত আলোচনার পর বোর্ড সদস্যদের সভার সম্মানি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে প্রতিটি সভায় যোগ দেওয়ার জন্য বোর্ড সদস্যদের সম্মানি ৮ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এক ধাক্কায় ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসেবে সদস্যদের সম্মানি বাড়লো ৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ সভায় উপস্থিত থাকলেই আগের নির্ধারিত সম্মানির চেয়ে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি অর্থ পাবেন বোর্ড সদস্যরা।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বর্তমানে সেতু বিভাগের সচিব নিজেই আবার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে আইনের ১৫ সদস্যের এই বোর্ডে কার্যত ১৪ জন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেদের সম্মানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আবার নিজেরাই।
সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, সেতু বিভাগের সচিব ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ নিজেই বোর্ড সভায় সম্মানি বাড়ানোর বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে অন্যান্য সদস্য মিলে সম্মানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ, সভার সম্মানি কারা পাবেন এবং কত পাবেন, তা নির্ধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরাই নিজেরা প্রস্তাবক এবং নিজেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
বিবিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সম্মানি বাড়িয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। তারা মনে করেন, এ ধরনের সম্মানি স্বাধীন কোনো বেতন বা ভাতা কমিশন দ্বারা মূল্যায়ন করা উচিত অথবা সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিজেদের পছন্দমতো সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে নিজেরাই নিজেদের সম্মানি নির্ধারণ করা কোনোভাবেই নৈতিক হতে পারে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের সম্মানির তুলনা করলে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গড়ে ৪ দশমিক ২৬ সদস্যের একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। দেশের সাধারণ মানুষের মাথাপিছু গড় মাসিক আয় মাত্র ৭ হাজার ১৪ টাকা। অর্থাৎ, দেশের একজন সাধারণ মানুষ পুরো এক মাসে যে টাকা আয় করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটি বোর্ড সভায় অংশ নিয়ে সম্মানি হিসেবে পাবেন তার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্মানি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত অমর্যাদাকর, স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি সচিবরা এমনিতেই উল্লেখযোগ্য বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। সেখানে সভার জন্য আলাদাভাবে সম্মানি বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মাত্র একটি সভায় যোগদানের সম্মানি যদি দেশের সাধারণ মানুষের গড় মাসিক আয়ের দ্বিগুণ হয়, তবে তা সাধারণ নাগরিকদের সাথে এক ধরনের উপহাস।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমলারা তো সরকারি টাকায় সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তাই নিজেদের সভার সম্মানি বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দোহাই দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বিশেষ করে অফিস চলাকালীন সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে কোনো সরকারি দপ্তরের বোর্ড সভায় অংশ নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের আলাদা করে অতিরিক্ত অর্থ বা সম্মানি নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ডের সদস্যদের সম্মানি ভাতা বাড়ানো প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের জন্য বোর্ড সভায় উপস্থিতির ক্ষেত্রে আলাদা সম্মানি ভাতা নেওয়ার কোনো নীতিগত যৌক্তিকতা নেই।’
এটিকে একটি গ্রহণযোগ্যতাহীন সংস্কৃতি হিসেবে অভিহিত করে তিনি জানান, নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে এভাবে নিজেদের ভাতা বাড়ানো অত্যন্ত অনৈতিক এবং লজ্জাজনক একটি বিষয়।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বোর্ড সভায় অংশগ্রহণকে কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছেন এবং জনগণের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনগণের কষ্টের অর্জিত অর্থের এমন অপচয় ও অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল নীতিমালারই পরিপন্থি নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের ওপর এক ধরনের অন্যায় ও চরম ক্ষমতার অপব্যবহারের নামান্তর।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় সদস্যদের ভাতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভাতা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমতা বজায় রেখেই নেওয়া হয়েছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, বোর্ডের পূর্বনির্ধারিত ভাতা অনেক আগে ধার্য করা হয়েছিল। বর্তমানে সরকার বিভিন্ন ভাতা এবং পরীক্ষার ফি বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া আগে ১০ শতাংশ ভ্যাট ও ট্যাক্স কাটার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে সরকার ২০ শতাংশ কর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ১৫ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হলেও ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৩ হাজার টাকা সরকারি খাতে চলে যাবে এবং প্রকৃতপক্ষে তা ১২ হাজার টাকায় দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আইএএফসি, ইটক্যাল কিংবা ন্যাচারাল বোর্ডের মতো অন্যান্য সংস্থায় একই হারে ভাতা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো নিজস্ব আয় থেকে তাদের ব্যয় নির্বাহ করে, সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। সার্বিকভাবে সরকারি নীতি ও অন্যান্য সমমানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে পাওয়া যায়নি।



