
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য পাওনা (অবসর ভাতা ও কল্যাণ সুবিধা) পাওয়ার জন্য ধুঁকে ধুঁকে অপেক্ষা করেছেন। অনেক শিক্ষক সারাজীবনের উপার্জিত অবসরের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই বিনা চিকিৎসায় অভাব-অনটনে মারা গেছেন এমন তথ্যও আছে অনেক।
বিগত কয়েক বছর ধরে এই অর্থ প্রদানের প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের তাদের নিজেদের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ পর্যন্ত দেওয়ার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি শিক্ষকদের এই দীর্ঘ বঞ্চনা, অনিয়ম এবং মানবিক বিপর্যয়ের অবসান ঘটিয়ে তাদের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এই বিশেষ উদ্যোগের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৭০ হাজারের বেশি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারী তাদের অবসর সুবিধা এবং ৫৩ হাজারের বেশি কল্যাণ সুবিধার আংশিক অর্থ পান।
সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে শিক্ষকদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। কোনো প্রকার ভোগান্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণা ছাড়াই যথাসময়ে অনলাইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শিক্ষকদের প্রাপ্য টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।
সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফলাও করে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন এবং প্রচারণা চালালেও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা বলছেন এখানেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে কেউ পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা, কেউ পেয়েছেন ১ লাখ টাকা, আবার কেউ ২, ৩ বা ৪ লাখ টাকা। পরের কিস্তির টাকা কবে পাবেন, জানেন না কেউ। আদৌ এই টাকা কোনো কাজে আসবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস ঘুরে শিক্ষকদের এমন অবস্থার সাক্ষী হয়েছে এশিয়া পোস্ট।
পুরো নয়, আংশিক অর্থ ছাড়
দীর্ঘ চার বছরের বকেয়া জট কাটাতে সরকার এককালীন ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করলেও শিক্ষকদের পুরো পাওনা দেওয়া সম্ভব হয়নি। অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে অবসরসুবিধার একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে বা হচ্ছে। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন, তাদের অনুকূলে এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। কল্যাণসুবিধার ক্ষেত্রেও একইভাবে একাংশের টাকা ছাড় করা হয়েছে। ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৬৪৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।
বর্তমানে শিক্ষকেরা কল্যাণ সুবিধার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং অবসর সুবিধার জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। মূলত চাকরিকালে শিক্ষকদের বেতন থেকে যে টাকা (অবসরের জন্য ৬ শতাংশ এবং কল্যাণের জন্য ৪ শতাংশ) কেটে রাখা হয়েছিল, বর্তমানে কেবল সেই জমা করা অর্থই শিক্ষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ শিক্ষকদের সাময়িক অপেক্ষার অবসান ঘটালেও তাদের মধ্যে গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আরও দীর্ঘ করছে অপেক্ষার প্রহর।
সাতক্ষীরার একটি মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাহফুজুর রহমান। তিনি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অবসরে গিয়ে জুলাই মাসে অবসরের অর্থপ্রাপ্তির আবেদন করেছেন। তিনি সম্প্রতি মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। কোনো সমস্যা হয়েছে কি না জানতে এসেছেন রাজধানীর অবসর সুবিধা বোর্ডে। তার সাথে কথা হয় এশিয়া পোস্টের।
তিনি বলেন, আমার অবসর গ্রহণের সময় থেকে হিসাব করলে আমি এত কম টাকা পাওয়ার কথা না। কোনো সমস্যা হয়েছে কি না জানতে এসেছি। কিন্তু সবাইকেই এভাবে দেওয়া হচ্ছে, এখান থেকে এমনটাই জানানো হলো। এটাকে ভোগান্তি কমানো বলে না।
সাইফুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষার্থী তার বাবার অবসরের টাকার ব্যাপারে বলেন, আমার বাবা পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, অবসরের টাকা পেলে তিনি হজে যাবেন। কিন্তু তিনি যে টাকা পেয়েছেন তা দিয়ে সেটা সম্ভব না। পরের বারের টাকা কবে পাব তাও জানি না। আদৌ পাব কি না সেটাও বলতে পারছি না। এই অল্প পরিমাণ টাকাটা একসময় খরচ হয়ে যাবে। শিক্ষকদের এভাবে টাকা দেওয়া বরং তাদের হয়রানি আরও দীর্ঘায়িত করা। তারা এই টাকা কোনো কাজেও লাগাতে পারবে না।
সংখ্যা বাড়াতে কিস্তিতে টাকা
অবসর ও কল্যাণ সুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সরকারের বিশেষ বরাদ্দ পাওয়ার পরে প্রথমে কথা হয়েছিল কল্যাণ ও অবসরের পুরাতন আবেদনকারী ১২ হাজার করে মোট ২৪ হাজার জনকে পূর্ণ টাকা দেওয়া হবে। তবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পরে সবাইকেই অল্প কিছু করে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় সংখ্যা অনেক বেশি দেখানো হলেও এই অবস্থার সুবিধাভোগীর সংখ্যা নিতান্তই সামান্য।
নেপথ্যে আর্থিক সংকট
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ সুবিধার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে আবেদনকারী শিক্ষকদের অবসর সুবিধার পুরো অর্থ মেটাতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন। এর বিপরীতে সরকার আপাতত মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করছে।
অন্যদিকে কল্যাণ সুবিধার ৩ হাজার কোটি টাকা পাওনার বিপরীতে ছাড় করা হয়েছে মাত্র ৬৪৭ কোটি টাকা। ফলে তারা চাইলেও সরকারের বড় ধরনের বিশেষ বরাদ্দ ছাড়া এই মুহূর্তে শিক্ষকদের পুরো পাওনা পরিশোধ করতে পারবেন না।
অর্ধেকের বেশি আবেদন আটকেছে জটিলতায়
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আবেদনকারী সবাইকেই আংশিক টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকের বেশি আবেদনকারী সেটা পাননি। বোর্ড থেকে আইবাস (প্লাস প্লাস)-এর কাছে নির্ধারিত অর্থ দেওয়া হলেও বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির কারণে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি।
এক্ষেত্রে বড় একটি অংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন লেনদেন না থাকায় তাদের অ্যাকাউন্ট সচল না থাকায় টাকা ফেরত এসেছে। আবার কারও নাম, জন্ম তারিখ কিংবা অন্যান্য সমস্যা থাকায় টাকা যায়নি। সেক্ষেত্রে সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাদের এনআইডি, ব্যাংকের সর্বশেষ স্টেটমেন্ট এবং আবেদনের কপি বোর্ডে জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
নেওয়া হচ্ছে না নতুন আবেদন
চলতি বছরের জুলাইয়ের পর যারা নতুন আবেদনের চেষ্টা করছেন তারাও ওটিপি না পাওয়া, আবেদন অসম্পূর্ণ থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এমন সমস্যা নিয়েও বেশ কয়েকজনকে রাজধানীর প্রবাসী কল্যাণ ভবনে অবস্থিত অবসর সুবিধা বোর্ডে আসতে দেখা গেছে।
এ ব্যাপারে এশিয়া পোস্টের সাথে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের কথা হয়েছে। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের সময়ে যারা ছিল, তারা এখান থেকে টাকা-পয়সা সব লুট করে নিয়ে গেছে আবার আমাদের সফটওয়্যারও নষ্ট করে দিয়ে গেছে। সফটওয়্যার নিয়ে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হবে।
পরবর্তী কিস্তি কবে দেওয়া হবে জানতে চাইলে মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, এখন সবার আগে আমাদের প্রায়োরিটি যারা নানান জটিলতার কারণে কোনো টাকা-ই পায়নি তাদের টাকাটা দেওয়া। বিশেষ বরাদ্দ না পেলে তো আমরা টাকা দিতে পারব না। তবে আশা করি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পরবর্তী ধাপের টাকা আমরা দিতে পারব।
কিছু আবেদনকারীকে মাত্র ৫ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা কিছু লোকজনকে এই পরিমাণ টাকা দিয়েছি কারণ সেই অ্যাকাউন্টগুলোর ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না। ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে এমন অ্যাকাউন্টগুলো আসলেই ঠিকঠাক আছে কি না—এটা যাচাই করতেই এমনটা করা হয়েছে। কিন্তু তারা এটাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে, আমরা নাকি তাদের ভিক্ষা দিয়েছি। যেখানে ২০২২ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো টাকাই দিতে পারেনি, সেখানে বিএনপি সরকার টাকা দিচ্ছে। আমরা চেষ্টা করতেছি যত দ্রুত টাকা দেওয়া যায়।



