
২০২৮ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। কিন্তু এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব।
দেশের প্রায় ২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে। সেখানে জাপানিজ, কোরিয়ান বা ম্যান্ডারিনের মতো ভাষার শিক্ষক নিয়োগ কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও একাধিক অনুষ্ঠানে এ নিয়ে কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, সরকার জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মানের মতো ভাষাগুলো শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। মূলত কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার এবং উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান চাহিদা মাথায় রেখে সরকার এই পরিকল্পনা নিয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মূল বাধা অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষকের সংকট এবং শিক্ষার্থীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ। এমন পরিস্থিতিতে সহসাই পাঠ্যক্রমে এটি বাধ্যতামূলক করার বাস্তবতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের সঙ্গে আলাপে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে নানামুখী সীমাবদ্ধতার চিত্র সামনে এসেছে।
শিক্ষক সংকট কতটা প্রকট
বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলে প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর প্রতিটিতে ইংরেজির বাইরে অন্তত একজন করে বিদেশি ভাষা শিক্ষক নিয়োগ করা বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।
স্কুলগুলোতে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে। সেখানে জাপানি বা ম্যান্ডারিনের মতো ভাষার শিক্ষক পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। যথাযথ পাঠদানের পরিবেশ ছাড়া কেবল বই দিয়ে ভাষা শেখানোও সম্ভব নয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আক্তার বানু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভাষা শিক্ষা অবশ্যই ভালো বিষয়। এতে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে যে ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার সেটি কেটে যাবে। কাজের সুযোগ, গবেষণা, যোগাযোগ অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। আমরা ইংরেজির দিকে দেখলে এটা বুঝতে পারব। ছোটবেলা থেকে শেখানোর পরও সবাই ইংরেজি পারে না। এই উদ্যোগ সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হবে জনবল নিয়ে। বাধ্যতামূলক করা হলে পাস-ফেলের ব্যাপারও থাকবে। মানে স্বাভাবিক পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়তি একটা চাপ তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘যে বিষয়টা আমি বাধ্যতামূলক করে দেব, সেটা শেখানোর জন্য সে পরিমাণ শিক্ষক আছে কি না! কোরিয়ান যদি আমি শিখতে চাই, কয়জন মানুষ আছে কোরিয়ান জানে? এ জন্য এটা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। সব প্রস্তুতি আছে কি না, এটা দেখার পর চালু করতে হবে। কারণ হুট করে চালু করার পর তো বন্ধ করা যায় না। এটা নিশ্চয়ই সরকারের মাথায় আছে।’
শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক ভাষাগত দক্ষতা
তৃতীয় ভাষা যুক্ত করার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান ভাষাগত দক্ষতা। কয়েক বছর আগে ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাংলা (২২%) ও ইংরেজিতে (২৭%) কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় তৃতীয় ভাষা তাদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশে ভাষা শিক্ষার প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখা। ১২ বছর ইংরেজি পড়ার পরও সাবলীল হতে পারছে না। এর কারণ হলো শিখন পদ্ধতি মূলত মুখস্থনির্ভর। তৃতীয় ভাষা যুক্ত করার ক্ষেত্রেও যদি একই ধারা বজায় থাকে, তবে এটি কেবল জিপিএ বাড়ানোর মাধ্যম হবে, কর্মক্ষেত্রে কোনো কাজে আসবে না।
অধ্যাপক আক্তার বানু বলেন, ‘প্রথমে অবশ্যই এটা অপশনাল বিষয় হতে হবে। বাধ্যতামূলক করে দিলে অনেকের অনাগ্রহ তৈরি হবে। এটা যদি অপশনাল থাকে তাহলে ঠিক আছে। চতুর্থ সাবজেক্ট হিসেবে ছেলেমেয়েরা পড়ুক, যদি দেখা যায়, ভালো করছে, তাহলে পরে বাধ্যতামূলক করার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।’
এনসিটিবির প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা
এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, ২০২৭ সালের পাঠ্যক্রম ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। বই ছাপানোর জন্য টেন্ডারের কাজ চলমান আছে। আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যেই কাজ মোটামুটি শেষ হবে। তাই ২০২৭ সালে এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তারা বলছেন, একটা বই যুক্ত করতে অনেক ধাপ পার করতে হয়। অনেক গবেষণা, এক্সপেরিমেন্ট করে তারপর সেটার বাস্তবতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হঠাৎ করেই বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। তাই অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, চাইলেই ২০২৮ সাল থেকে এটি বাধ্যতামূলক করা সম্ভব নয়।
এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকার অবশ্যই একটা ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা তৃতীয় ভাষার জন্যে কোন ভাষা নির্বাচন করব? এটা আঞ্চলিক চাহিদার কারণে হবে? নাকি শিক্ষার্থীদের পছন্দে হবে? নাকি সবাইকে একই বিষয় পড়তে দেওয়া হবে? এসব ঠিক করার জন্য অনেক গবেষণা প্রয়োজন। আমরা চেষ্টা করব সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে।’
পাঠ্যক্রমে তৃতীয় ভাষা যুক্ত করতে ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চারজন অধ্যাপক এবং এনসিটিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বাংলা বইয়ে নতুন অধ্যায়
২০২৭ সালের পাঠ্যক্রমে আলাদা বই হিসেবে যুক্ত না হলেও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা ও মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলা বইয়ে একটি অধ্যায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতে ২০২৮ সালের পাঠ্যক্রমে আলাদা বই যুক্ত হলেও আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি থাকে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) প্রফেসর মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২০২৭ সালের বাংলা বইয়ে আমরা তৃতীয় ভাষা বা তৃতীয় ভাষার গুরুত্ব শিরোনামে একটি অধ্যায় যুক্ত করতে যাচ্ছি। যাতে ভবিষ্যতে বই হিসেবে যুক্ত হলেও শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। এই শিরোনামের লেখাটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (আমাই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের কাছ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে সেভাবেই অগ্রসর হব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
দেশের ২৫টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এগুলোতে জাপানিজ, কোরিয়ান, চাইনিজ, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মানসহ আটটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানো হবে।
এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হবে।
.png)



