logo

বদলে যাচ্ছে শীত, আতঙ্কের কথা জানালেন জেসি ডিগিন্স

বদলে যাচ্ছে শীত, আতঙ্কের কথা জানালেন জেসি ডিগিন্স

জেসি ডিগিন্স একজন সহনশীলতার ক্রীড়াবিদ। অলিম্পিক ক্রস কান্ট্রি স্কিয়ার হিসেবে তিনি জানেন তার খেলায় কতটা শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হয়। তিনি এই চরম পরিশ্রমকে বলেন পেইন কেভ। এই কষ্ট তাকে ভয় দেখায় না, কারণ এটি তার নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু যেটি তাকে সত্যিই আতঙ্কিত করে, সেটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। কারণ এর প্রভাব তার খেলাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, আর এটি পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

ডিগিন্স দেখছেন, পরিস্থিতি চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এমন বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি যেখানে টানা বৃষ্টি হয়েছে, স্কি করার মতো বরফের সরু একটি ফিতাও ঠিকমতো ছিল না। পুরো মৌসুম রাতারাতি বদলে গেছে। তিনি তার ব্লগে লিখেছেন, কৃত্রিম বরফ ছাড়া এখন শীতকালীন ক্রীড়া আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব।

ইতালির আল্পস পর্বতমালায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মিলান কোর্তিনা শীতকালীন অলিম্পিক, যা ডিগিন্সের শেষ অলিম্পিক হবে, সেখানেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে তুষার তৈরির মেশিন চালিয়ে বরফ তৈরি করা হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে শীত
মানুষ এখনও ব্যাপক হারে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াচ্ছে, যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শীতের ওপর। অনেক এলাকায় তুষারপাত কমছে, বরফের স্তর পাতলা হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে। এক সময় যেসব পাহাড় মোটা সাদা বরফে ঢেকে থাকত, এখন শীতের বড় একটি সময়জুড়েই সেগুলো প্রায় খালি পড়ে থাকে।

যারা জীবিকার জন্য তুষারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য প্রতিটি স্কি মৌসুম এখন অনিশ্চয়তায় ভরা। শীতকালীন অলিম্পিকের মতো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির এক মুখপাত্রের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের পরিচিত শীতকালীন ক্রীড়াকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।

অ্যাথলেটরা ইতালিতে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকলেও, শীতকালীন অলিম্পিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুধু কীভাবে এই আয়োজন টিকিয়ে রাখা যাবে তা নয়, আদৌ রাখা উচিত কি না, সেই বিতর্কও জোরালো হচ্ছে।

অলিম্পিক যেন গলে যাচ্ছে
১৯২৪ সালে ফ্রান্সে প্রথম শীতকালীন অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়। তখন প্রায় সব ইভেন্টই ছিল খোলা মাঠে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে আইস স্কেটিং, হকি, কার্লিংয়ের মতো অনেক খেলা ইনডোর রিঙ্কে চলে যায়, যেখানে বরফের মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবুও তুষার ও ঠান্ডা আবহাওয়া দিন দিন অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর থেকে প্রতিটি অলিম্পিক আয়োজক শহরে ফেব্রুয়ারির গড় তাপমাত্রা প্রায় ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।

ইতালির কোর্তিনা দ’আমপেজ্জো শহর, যেখানে ১৯৫৬ সালেও অলিম্পিক হয়েছিল, সেখানে গত ৭০ বছরে ফেব্রুয়ারির তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৩.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে বছরে প্রায় ৪১ দিন কম সময় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে। ঠান্ডা কম থাকলে বরফ হয় ভেজা ও পাতলা, বৃষ্টিপাত বাড়ে, যা অ্যাথলেটদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১৪ সালে রাশিয়ার সোচি অলিম্পিকে অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে দুর্ঘটনা ও চোটের হার বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজা ও নরম বরফে অ্যাথলেটরা প্রত্যাশিত গতি পায়নি, ল্যান্ডিং সঠিকভাবে করতে পারেনি।

কমে আসছে আয়োজক শহর
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে অতীত ও সম্ভাব্য ৯৩টি আয়োজক স্থান নিয়ে গবেষণা করা হয়। দেখা গেছে, দেশগুলো তাদের বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেও ২০৫০ সালের মধ্যে মাত্র ৫২টি স্থান শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের উপযোগী থাকবে।

প্যারালিম্পিকের জন্য পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। মৌসুমের পরে হওয়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া থাকবে মাত্র ২২টি স্থানে। যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আরও বাড়ে, সেই সংখ্যা নেমে আসতে পারে মাত্র ৪টিতে।

২০৫০ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক তুষারের ওপর ভর করে আয়োজন করতে পারবে সম্ভবত মাত্র চারটি স্থান, যার মধ্যে জাপানের নিসেকো এবং ফ্রান্সের ভ্যাল দিজেয়ার ও কুরশেভেল উল্লেখযোগ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের সম্ভাবনা সত্যিই গলে যেতে পারে।

তুষার কমার বিপজ্জনক প্রবণতা
শীতের দ্রুত পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন হলো তুষার কমে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে এ বছর অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে তুষার খরা দেখা গেছে। ২০৩৪ সালের অলিম্পিক আয়োজক সল্ট লেক সিটিতে জানুয়ারিতে তুষারপাত হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।

২০২৪ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গত ৪০ বছরে উত্তর গোলার্ধের বেশিরভাগ এলাকায় তুষারের স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় অংশে প্রতি দশকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা পার হলে তুষার দ্রুত কমতে শুরু করে। অর্থাৎ এক সময় পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও হঠাৎ করেই পরিস্থিতি অবনতির দিকে যেতে পারে।

কৃত্রিম তুষার কি সমাধান
প্রাকৃতিক তুষার না হলে প্রযুক্তির সহায়তায় কৃত্রিম তুষার তৈরি করা হয়। ১৯৮০ সালে প্রথম অলিম্পিকে এটি ব্যবহার হয়। ২০২২ সালের বেইজিং অলিম্পিকে প্রায় পুরোপুরি কৃত্রিম তুষারের ওপর নির্ভর করা হয়েছিল।

ইতালিতে চলতি অলিম্পিকের জন্য প্রায় ২৪ লাখ ঘনমিটার তুষার তৈরি করা হয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন হয়েছে বিপুল পরিমাণ পানি।

তবে কৃত্রিম তুষার তৈরিরও সীমাবদ্ধতা আছে। কম তাপমাত্রা ও শুষ্ক বাতাস দরকার হয়, যা উষ্ণায়নের কারণে কমে যাচ্ছে। এছাড়া এতে পানি ও বিদ্যুতের বড় ব্যবহার রয়েছে, যা পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কৃত্রিম তুষার একটি সাময়িক সমাধান হলেও এটি মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, জলবায়ু সংকটের সময় এত বড় আয়োজন কতটা যৌক্তিক।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সমাধান হিসেবে অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক একসঙ্গে আয়োজন বা ক্যালেন্ডার এগিয়ে আনার প্রস্তাব এসেছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও নমনীয় পদ্ধতিতে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০৩০ সাল থেকে আয়োজক দেশগুলোর জন্য জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপ বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।

তবে বিষয়টি শুধু অলিম্পিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তুষার হলো প্রাকৃতিক পানির ভাণ্ডার। শীতে এটি পানি ধরে রাখে এবং গ্রীষ্মে ধীরে ধীরে গলে পানীয় জল, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করে। বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

শীতকালীন অলিম্পিক একটি বড় বৈশ্বিক মঞ্চ। এই মঞ্চ জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবকে সামনে আনতে পারে। ক্রীড়াবিদরা বলছেন, এটি তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়। তারা প্রতিদিন অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব অনুভব করছেন।

শীতকালীন অলিম্পিক কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি শীতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিক অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই অনেক ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু এই আয়োজনের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো উষ্ণ দেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, অনিয়মিত বৃষ্টি আমাদের জন্য যেমন বাস্তবতা, তেমনি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জন্য তুষার কমে যাওয়া আরেক বাস্তবতা। খেলাধুলার ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে পরিবেশ রক্ষার লড়াইও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

শীতকে বাঁচানো মানে শুধু একটি অলিম্পিক আয়োজন বাঁচানো নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। এখন সিদ্ধান্ত মানবজাতির।

সূত্র: সিএনএন