logo

মেক্সিকোয় কার্টেল সহিংসতা: বিশ্বকাপ আয়োজন কি ঝুঁকিতে

মেক্সিকোয় কার্টেল সহিংসতা: বিশ্বকাপ আয়োজন কি ঝুঁকিতে

ফুটবল বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন চলছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব শুরু হতে বাকি মাত্র ১০৭ দিন। কিন্তু সহ-আয়োজক মেক্সিকোয় হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া কার্টেল সহিংসতা সেই উৎসবের প্রস্তুতিতে ফেলেছে ঘোর অনিশ্চয়তার ছায়া।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া মেক্সিকোজুড়ে বন্দুকযুদ্ধ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, মহাসড়কে জ্বলন্ত যানবাহন, সশস্ত্র টহল, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন শহর।

সবকিছুর সূত্রপাত জালিস্কো অঙ্গরাজ্যে। মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী অপরাধচক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (CJNG) শীর্ষ নেতা নেমেসিও ওসেগুয়েরা সারভান্তেস ওরফে ‘এল মেনচো’ সেনা অভিযানে নিহত হওয়ার পরই এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২৫ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ফুটবল ভক্তদের মনে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ নিয়ে উদ্বেগ।

বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলো কতটা নিরাপদ?

জালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাহারা—যেখানে চারটি বিশ্বকাপ ম্যাচ হওয়ার কথা—বর্তমানে ‘কোড রেড’ নিরাপত্তা পরিস্থিতির আওতায়। মেক্সিকো সিটিতে নির্ধারিত রয়েছে পাঁচটি ম্যাচ, মনতেরেতে চারটি।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন স্বাভাবিক—বিশ্বকাপ আয়োজন কি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে?

bigStoryContent

নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. হাভিয়ের এসকাউরিয়াতজা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘কার্টেলদের ওপর চাপ বাড়ালে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসবেই। কিন্তু ঝুঁকির জায়গাটা হলো—পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিকে স্থিতিশীল করা অত্যন্ত কঠিন।’

এল মেনচোর মৃত্যুর পর মেক্সিকোর অপরাধ জগতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ইতিহাস বলছে, এমন অবস্থায় কার্টেলের ভেতরে নেতৃত্বের লড়াই শুরু হতে পারে, যা সহিংসতার নতুন ঢেউ তৈরি করে।

তবে এসকাউরিয়াতজা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কার্টেলগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে। তারা রেস্তোরাঁ, হোটেল, স্থানীয় ব্যবসায় জড়িত। বিশ্বকাপ সফল হলে পর্যটন বাড়বে, অর্থ আসবে। সেটি তাদেরও লাভ।’

পর্যটকদের ঝুঁকি কতটা?

বিশ্বকাপ মানে লাখো দর্শকের সমাগম। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এরই মধ্যে জালিস্কোয় থাকা নাগরিকদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কানাডা পুয়ের্তো ভাল্লার্তা বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং অ্যাপে দেখা গেছে একাধিক বিমান মাঝপথ থেকে ঘুরে গেছে।

bigStoryContent

ইউডব্লিউই ব্রিস্টলের অপরাধবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ড. কারিনা গার্সিয়া-রেইয়েস বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য মাঝারি ঝুঁকি থাকবে। তবে যদি বড় আকারের সামরিক অভিযান আর না বাড়ে, তাহলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে। দর্শকরা নির্দেশনা মানলে নিরাপদ থাকতে পারেন।’

ফুটবলে তাৎক্ষণিক প্রভাব

সহিংসতার কারণে দেশটির চারটি পেশাদার লিগ ম্যাচ স্থগিত হয়েছে—দুটি শীর্ষ বিভাগে, দুটি দ্বিতীয় বিভাগে। অর্থাৎ প্রভাব ইতোমধ্যেই ফুটবল অবকাঠামোয় পড়তে শুরু করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও বিশ্বকাপ ঘিরে নিরাপত্তা বিতর্ক চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বড় শহরগুলোতে অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মকর্তাদের মোতায়েন করেছে, যা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় সমর্থক সংগঠনগুলো ‘অতিরিক্ত পুলিশি সামরিকীকরণ’ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপ এখন নিরাপত্তা-রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে।

সাময়িক বিস্ফোরণ, নাকি দীর্ঘ অস্থিরতা?

এদিকে এল কোলেজিও দে মেক্সিকোর অধ্যাপক মনিকা সেররানো ক্যারেতো বলেন, ‘ অনেকে আশা করছেন এটি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, যা সময়ের সঙ্গে থিতিয়ে যাবে। তবে নতুন এক অস্থিরতার অধ্যায় শুরু হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।’

কার্টেলগুলোর হাতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র রয়েছে। অতীতে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার নজিরও আছে। ফলে সামরিক প্রতিক্রিয়া আরও সংঘাত ডেকে আনতে পারে।

সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জন বেঞ্জামিন যোগ করেন,  ‘যুক্তরাষ্ট্র কার্টেলগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেক্সিকো ইতোমধ্যে বহু কার্টেল সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে। এটা আসলে ভূ-রাজনৈতিক চাপের বর্তমান পরিস্থিতির অংশ।’

বিশ্বকাপের ভাবমূর্তি বনাম বাস্তবতা

বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল নয়; এটি একটি দেশের বৈশ্বিক পরিচয়ের প্রদর্শন। এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যে ছবি ঘুরছে—জ্বলন্ত বাস, সশস্ত্র টহল—তা দর্শকদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলবে।

তবে বড় ক্রীড়া আসর সামনে থাকলে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সমন্বয় গড়ে তোলে। প্রশ্ন হচ্ছে, এবার সেটি কতটা কার্যকর হবে?

ফিফা এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়—মেক্সিকোর রাস্তায় যে ধোঁয়া উঠছে, তা শুধু স্থানীয় সংঘর্ষের নয়; বিশ্বকাপের প্রস্তুতির ওপরও তার ছায়া পড়েছে।

এখন দেখার—এটি ক্ষণস্থায়ী বিস্ফোরণ, নাকি দীর্ঘ অস্থিরতার সূচনা।