মনু ভাকেরকে ক্রিকেট নিয়ে প্রশ্ন, ভারতের ক্রীড়া সংস্কৃতি নিয়ে নতুন বিতর্ক

ভারতকে কি একটি স্পোর্টিং নেশন বলা যায়? প্রশ্নটা নতুন নয়। তবে সম্প্রতি ভারতের হয়ে অলিম্পিক পদকজয়ী শুটার মনু ভাকেরকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই পুরোনো প্রশ্নটাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।
দিল্লিতে ভারতের ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মনু ভাকের। স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল তার বর্ণাঢ্য শুটিং ক্যারিয়ার, অলিম্পিক সাফল্য, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কিংবা ভারতের শুটিংয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের এক প্রশ্নে আলোচনার দিক ঘুরে যায় ক্রিকেটে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় ১৫ বছর বয়সি ক্রিকেট সেনসেশন বৈভব সূর্যবংশীকে নিয়ে।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নিজের ফেডারেশনের অনুষ্ঠানে একজন অলিম্পিক তারকাকে কেন ক্রিকেট নিয়ে মন্তব্য করতে হবে? মনু ভাকেরের মতো ক্রীড়াবিদের অর্জন কি নিজে আলোচনার জন্য যথেষ্ট নয়?
বিতর্কের মূল জায়গাটা এখানেই। মনু ভাকের ১৬ বছর বয়সেই সিনিয়র বিশ্বকাপে সোনা জিতে আন্তর্জাতিক শুটিংয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। তখন তিনি ভারতের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ। কিন্তু সেই সময় কি বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাকে মনু ভাকেরের উত্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল? হয়নি। তাহলে উল্টোটা এত স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় কেন?
ভারতের ক্রীড়া সংস্কৃতির এই একমুখী বাস্তবতা অনেক দিন ধরেই আলোচনায়। ক্রিকেট দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অন্য খেলার সাফল্যও ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত না হলে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস বা কমনওয়েলথ গেমসের সময় শুটিং, ব্যাডমিন্টন, কুস্তি, অ্যাথলেটিকস আলোচনায় আসে। টুর্নামেন্ট শেষ হলেই আবার অনেক খেলাই মূলধারার আলোচনার বাইরে চলে যায়।
মনু ভাকেরের ঘটনাটি তাই শুধু একটি প্রশ্ন বা একটি ভিডিও ক্লিপের বিষয় নয়। এটি ভারতের ক্রীড়া মানসিকতার গভীর সমস্যার প্রতিচ্ছবি। একজন দ্বৈত অলিম্পিক পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ যখন নিজের খেলার অনুষ্ঠানে উপস্থিত, তখন তার কাছ থেকে ক্রিকেটের নতুন প্রতিভাকে বৈধতা দেওয়ার মতো মন্তব্য চাওয়া আসলে সেই পুরোনো শ্রেণিবিন্যাসকেই সামনে আনে।
ভারত বহু বছর ধরেই নিজেকে স্পোর্টিং নেশন হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু সেটি কেবল পদক জিতে সম্ভব নয়। সেই পরিবর্তন শুরু হতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। একজন শুটার, বক্সার, কুস্তিগির বা অ্যাথলেটকে ক্রিকেটারের মতোই সম্মান এবং মনোযোগ দিতে না পারলে স্পোর্টিং নেশন হওয়ার দাবি কাগজেই থেকে যাবে।
এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একটি ইতিবাচক দিকও দেখিয়েছে। অনেক ক্রীড়াপ্রেমী বুঝেছেন, মনু ভাকেরের মতো একজন অলিম্পিক আইকনকে তার নিজের অর্জনের জায়গা থেকে সরিয়ে ক্রিকেটের আলোচনায় টেনে নেওয়া ন্যায্য নয়। অর্থাৎ দর্শক ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ হয়তো এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন।