শচীনের অমর কীর্তি: ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির গল্প

কল্পনা করুন, একটা সাধারণ দিনের ওয়ানডে ম্যাচ। গোয়ালিয়রের ক্যাপ্টেন রূপ সিং স্টেডিয়ামে দর্শকরা উত্তেজিত, কিন্তু কেউ জানত না, এই দিনটা ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা হয়ে যাবে, স্বর্ণাক্ষরে। বল হাতে ডেল স্টেইন, জ্যাক ক্যালিসের মতো বিশ্বের সেরা বোলাররা। আর ব্যাট হাতে একজন – শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। ১৪৭ বলে ২০০ রান, তাও আবার অপরাজিত। চারপাশে উল্লাসের ঝড়, কাঁপছিলো স্টেডিয়াম। শচীনের সেই ইনিংসটা শুধুই একটা ইনিংস ছিলো না, সেটা ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। দিনটা, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০। আজ থেকে ঠিক ১৬ বছর আগে! শচীন হয়ে ওঠেন ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান।
আপনি ভাবতেই পারেন, প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, তো কি হয়েছে। ওই শচীনের উত্তরসূরী রোহিত শর্মাই তো একাই করেছেন তিন তিনটা ডাবল সেঞ্চুরি। তবুও ২৪ ফেব্রুয়ারিতে শচীনকে নিয়ে কেনো গোটা বিশ্বের মিডিয়া আলাদা ফিচার করে, কেন এই দিনটিকে এতটা গুরুত্ব দেয়া হয়, আজ এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জানবো সেটাই।
ক্রিকেটের যাত্রার পর প্রায় একশো বছর পর শুরু হয়, ওয়ানডে ক্রিকেট। ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের ম্যাচ দিয়ে একদিনের ক্রিকেটের পথচলা শুরু। প্রথম দিকে নিয়ম নিয়ে ছিলো বেশ কিছু জটিলতা। তবে ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ থেকে ৫০ ওভারের ক্রিকেটকে আইসিসি ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে। শুরুর দিকে ওয়ানডে ম্যাচে দুশো থেকে আড়াইশো রানই ছিলো বেশ ফাইটিং স্কোর। সেই ম্যাচগুলোতে একজন ব্যাটসম্যান সর্বোচ্চ একটা সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখতো। ডাবল সেঞ্চুরি তখন অনেকটাই অসম্ভব ব্যাপার ছিলো।
অসম্ভব হলেও ওয়ানডে ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করার কল্পনা হয়তো অনেকেরই ছিলো। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে যার বীজ বুনেছিলেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক কপিল দেব। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৭ রানেই ৫ উইকেট হারায় ভারত। দর্শকরা যখন ধরেই নিয়েছিলো ভারত আরেকটা লজ্জাজনক পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন ক্যাপ্টেন কপিল দেব। ১৩৮ বলে খেলেন ১৭৫ রানের এমন এক ইনিংস, যেটা শুধুই একটা ইনিংস নয়, সেটা ছিলো এমন এক অনুপ্রেরণার গল্প, যা ভারতীয় ক্রিকেটকেই বদলে দেয়। শুধুই কি ভারতীয়? গোটা ক্রিকেট বিশ্বই তখন পেয়েছিলো একটাই ম্যাসেজ, নেভার গিভ আপ। ৬০ ওভারের সেই ম্যাচে কপিল দেব হয়তো করতে পারেননি ডাবল সেঞ্চুরি, কিন্তু ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরির সত্যিকারের পথপ্রদর্শক হিসেবে কপিল দেবের নামটাই জোড়ে সোড়ে উচ্চারিত হয়।
ঠিক এক বছর পর। ১৯৮৪ সালের ৩১ মে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডস লেখেন আরও এক অনুপ্রেরনার গল্প। ৫৫ ওভারের সেই ওয়ানডে ম্যাচে ক্যারিবিয়ানরা টস জিতে নেয় ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত। সেই ভারতের মতো ক্যারিবিয়ানরাও আগে ব্যাট করতে নেমে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। স্কোরবোর্ডে ১০০ রান তুলতেই সাত উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর টেলেন্ডারদের নিয়ে দলের হাল ধরেন ভিভ রিচার্ডস। এদিন তিনি ছাড়িয়ে যান কপিল দেবকেও। খেলেন ১৭০ বলে ১৮৯ রানের অপরাজিত এক ইনিংস। ভিভ রিচার্ডসের দুর্দান্ত এই ইনিংসে ইংল্যান্ডকে তাদেরই ঘরের মাঠে হারের স্বাদ ঠিকই দিয়েছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ, কিন্তু ভিভের ব্যাক্তিগত ডাবল সেঞ্চুরি আর করা হয়নি। দর্শকদেরও অপেক্ষাটা বেড়ে যায়।
প্রায় এক যুগ পর, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার গ্যারি কার্সটেনের সামনে সুযোগ ছিলো প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নেমে ১০৩ বলে করেন সেঞ্চুরি, ১৫০ পেরিয়ে যান ১৩৫ বলে। শেষের দিকে আরও আগ্রাসী ব্যাটিং করলেও ডাবল সেঞ্চুরি আর করা হয়নি। ১২ রানের আক্ষেপ নিয়ে ১৮৮ রানেই থামে গ্যারি কার্সটেনের ইনিংস। সমর্থকদের ডাবল সেঞ্চুরি দেখার স্বপ্ন পূরণ না হলেও গ্যারি কার্সটেনের ওই ইনিংস ছিলো তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত স্কোর।
তবে ঠিক পরের বছরই এশিয়ার সবচেয়ে হাইভোল্টেজ ম্যাচ ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ে সাইদ আনোয়ার লেখেন নতুন এক গল্প। ভারতের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানি ব্যাটাররা আসা যাওয়ার মিছিলে থাকলেও উইকেটের এক পাশে টিকে থাকেন সাইদ আনোয়ার। খেলেন ১৪৬ বলে ১৯৪ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। পাকিস্তান পায় ৩২৭ রানের সংগ্রহ, জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভারত অলআউট হয় ২৯২ রানে। ভারতের মাটিতে ভারতকে ৩৫ রানে হারের স্বাদ দেয় পাকিস্তান। একই সাথে সাইদ আনোয়ার গড়েন ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। প্রায় ১৩ বছর অক্ষুন্ন থাকে তার এই রেকর্ড। ওই একটা ইনিংসই সাইদ আনোয়ারকে পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ওয়নেডে ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলে।
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যেই রেকর্ডটা ভাঙতে না পারলেও ২০০৯ সালে সাইদ আনোয়ারের রেকর্ডে ভাগ বসান জিম্বাবুয়ের চার্লস কভেন্ট্রি। বাংলাদেশের বিপক্ষে এক ওয়ানডে ম্যাচে ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নেমে ১৫৬ বলে ১৯৪ রান করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। ওই ম্যাচে জিম্বাবুয়ের ৩১২ রানের পাহাড়সম টার্গে চেইজ করতে নেমে বাংলাদেশের তামিম ইকবালও খেলেছিলেন ১৫৪ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। কিন্তু কারোরই পাওয়া হয়নি ডাবল সেঞ্চুরি। তবে ১৩ বছর পর চার্লস কভেন্ট্রি ১৯৪ রান করে যেন জানান দিয়েছিলেন ২০০ রান আর খুব বেশি দেরি নয়। এটা এখন যেকোনো ম্যাচেই হতে পারে।
সাইদ আনোয়ারের ১৯৪ রান প্রায় ১৩ বছর ধরে অক্ষুন্ন থাকায়, অনেকেই ধরে নিয়েছিলো, ২০০ রান অসম্ভব। তবে চার্লস কভেন্ট্রি আবারো ১৯৪ রান করে বুঝিয়ে দিলেন ২০০ রান খুবই সম্ভব, এবং এর জন্য দরকার আরেকটা ধাক্কা। আর সেই ধাক্কাটাই আসে ছয় মাস পর। যার কারিগর শচীন টেন্ডুলকার। ইতিহাসের প্রথম কোনো ব্যাটার হিসেবে ছুয়ে ফেলেন ডাবল সেঞ্চুরি। বয়সটা তখন প্রায় ছত্রিশ। প্রায় ২০ বছরের ক্যারিয়ার! কত রেকর্ডই তো লিখেছেন নিজের নামের পাশে। কিন্তু শেষবেলায় ওই রেকর্ডটা যে গড়বেন, তা হয়তো অনেকের কল্পনায় ছিলো না।
শচীনের সেই দুশো রানের ইনিংসটা শুরু থেকেই ছিলো ড্রামাটিক। প্রথম ৫০ রান করেন ৩৭ বলে, ১০০ রান করতে খেলেন ৯০ বল আর ১৫০ পেরিয়ে যান ১১৮ বলে। তখন থেকে স্টেডিয়ামে থাকা সমর্থকরা কিছুটা আচ করতে পেরেছিলো, আজ কিছু একটা করে দেখাবে, ইন্ডিয়ার লিটল মাস্টার। কারণ শচীনকে তখন সঙ্গ দিচ্ছিলেন মাহেন্দ্র সিং ধোনি। দুজনের জুটিও হয়েছিলো সেদিন ১৯৪ রানের। ইনিংষের শেষ ওভারের তৃতীয় বলে অবশেষে আসেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ওয়েন পার্নেলের বলে একটা সিঙ্গেল নিয়ে হয়ে যান ইতিহাসের অংশ। বনে যান প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান। সেদিন স্টেডিয়ামে থাকা দর্শকরাও হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। কতো সমর্থকই না চেয়েছিলো এই ম্যাজিক ফিগারটা মাঠে বসে কিংবা টিভি সেটের সামনে বসে উপভোগ করতে। কতবারই তো হতাশ হয়েছে সমর্থকরা। সবকিছুকে পেছনে ফেলে শচীন টেন্ডুলকার খুলে দেন ওয়ানডে ক্রিকেটের নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার।
শচীনের দেখানো সেই পথে পাড়ি দিয়েছে আরও অনেক ব্যাটসম্যান। শচীনের পর ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন আরও ৯ ব্যাটসম্যান। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে মোট ডাবল সেঞ্চুরির সংখ্যা ১৩। কারণ শচীনের উত্তরসূরী ভারতীয় আরেক কিংবদন্তি রোহিত শর্মা একাই করেছেন তিনটা ডাবল সেঞ্চুরি। এক ভারতীয় শচীন উন্মুকত করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরির দ্বার, আরেক ভারতীয় রোহিত সেটাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়েছেন, ওর রেকর্ড ভাঙবার সামর্থ্য যে নেই আর কারো। ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনটির বেশি ডাবল সেঞ্চুরি করা এক রকম অসম্ভবই বটে।
শচীনের সেই দুশো রানের ইনিংসের গল্পটা এখানেই শেষ হয়না, তবুও শেষ তো করতেই হয়। প্রায় ৪০ বছর ধরে যেই ইনিংসের অপেক্ষায় ছিলো গোটা পৃথিবি, সেই রেকর্ডটা হয়েছিলে এমনই এক ২৪ ফেব্রুয়ারি। ১৬ বছরেও পরেও স্মৃতিটা অমিলন। ধন্যবাদ শচীন; আজ আর বলতে দ্বিধা নেই, আপনার জন্যই ক্রিকেট এতটা সুন্দর।