বিতর্কের কেন্দ্রেও অপরিহার্য ইনফান্তিনো, দশ বছরে ফিফার রূপান্তরের গল্প

একসময় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা মানেই ছিল কেলেঙ্কারি, গ্রেপ্তার, স্পনসরদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং আস্থার গভীর সংকট। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি তখন যেন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ঠিক সেই অস্থির সময়েই দায়িত্ব নেন ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সময় তার প্রতিশ্রুতি ছিল স্পষ্ট ‘ফিফাকে ফিরিয়ে আনব ফুটবলে, আর ফুটবলকে ফিরিয়ে আনব ফিফা’।
দশ বছর পর প্রশ্নটা তাই সরল নয়—তিনি কি সত্যিই ফিফাকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, নাকি নতুন বিতর্কের এক যুগের সূচনা করেছেন?
ভাঙা ফিফা থেকে অর্থের জোয়ার
ইনফান্তিনো ফিফার দায়িত্ব নেন এমন এক সময়ে, যখন সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারের পদত্যাগের পর ফিফা দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে। বড় স্পনসররা সরে গেলে আর্থিক সংকটও তীব্র হয়, প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতির কথা প্রকাশ্যে আসে।
তবে তার দায়িত্বের দশ বছরে চিত্র পুরো পাল্টে গেছে। ২০২৬ পর্যন্ত তিন বছরের আর্থিক চক্রে ফিফা ১৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের প্রত্যাশা করছে, রেকর্ড পরিমাণ।
‘ফিফা ফরওয়ার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-২২ মেয়াদে ২.৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে ২১১টি সদস্য দেশের ১,৬০০–এর বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে। ২০২৩-২৬ চক্রে তহবিল আরও ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি সদস্য দেশ অতিরিক্ত ৫ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতিটি কনফেডারেশন ৬০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পেয়েছে।
অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর শাসনে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে নজিরবিহীনভাবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু ছোট ফেডারেশনের কাছে তিনি তাই উন্নয়নের প্রতীক।
তবে অর্থনৈতিক সাফল্যের এই গল্পের আড়ালেই জমেছে নতুন বিতর্কের স্তর।
বিশ্বকাপের বিস্তার ও নতুন প্রশ্ন
নির্বাচনের সময় ইনফান্তিনো ৪০ দলের বিশ্বকাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এক বছরের মধ্যে সেটি দাঁড়ায় ৪৮ দলে। ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর।
এর পাশাপাশি চালু হয়েছে সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপ—যা ইউরোপীয় লিগ ও খেলোয়াড় ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত সূচি খেলোয়াড়দের বিশ্রাম কমিয়ে দিচ্ছে এবং বাণিজ্যিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগে মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ইনফান্তিনোর বক্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমি কাতারি… আজ আমি অভিবাসী শ্রমিক।’
অনেকে একে সাহসী অবস্থান বলেছেন, আবার অনেকের মতে এটি বাস্তব সংকটকে সরলীকরণ।
এরপর ২০৩০ বিশ্বকাপ তিন মহাদেশে আয়োজন এবং ২০৩৪ বিশ্বকাপ কার্যত সৌদি আরবের হাতে যাওয়ার প্রক্রিয়াও প্রশ্ন তুলেছে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে। নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন প্রকাশ্যেই আপত্তি জানায়।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও বিতর্ক
ইনফান্তিনোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতাও ইউরোপীয় মহলে অস্বস্তি তৈরি করে।
২০২৫ সালে ফিফা কংগ্রেসে দেরিতে পৌঁছানো, ট্রাম্পকে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান—এসব ঘটনাকে অনেকে ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন হিসেবে দেখেন। একপর্যায়ে উয়েফা কংগ্রেস বয়কটও করে।

এদিকে ২০২৪ সালে ইনফান্তিনোর বেতন ৩৩% বৃদ্ধি পেয়ে বছরে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়। যদিও ফিফা জানিয়েছে, এটি স্বাধীন কমিটির অনুমোদিত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অংশ।
টিকিট মূল্য ও জনমত
২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট মূল্য ২০২২–এর তুলনায় অনেক বেশি। নিউ জার্সিতে ফাইনালের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ৩,০০০ পাউন্ডেরও বেশি।
সমালোচনার জবাবে ইনফান্তিনোর যুক্তি—চাহিদা ‘অস্বাভাবিকভাবে বেশি’ এবং এই অর্থ আবার ফুটবল উন্নয়নেই বিনিয়োগ করা হবে।
তার দাবি, ‘ফিফা না থাকলে ১৫০টি দেশে ফুটবল টিকত না।’
কেন তার অবস্থান অটুট?
সব বিতর্ক সত্ত্বেও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ২০১৯ ও ২০২৩—দুইবারই তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৭ সালেও তিনি প্রার্থী হতে পারবেন, কারণ প্রথম তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণ্য হয়নি।
ফিফার ২১১ ভোটের প্রায় অর্ধেকই এশিয়া ও আফ্রিকার হাতে—যে অঞ্চলগুলো আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। ফলে ইউরোপে সমালোচনা থাকলেও বৈশ্বিক ভোটের অঙ্কে তিনি শক্ত অবস্থানে।
উত্তরাধিকার: ত্রাতা, না বিতর্কের স্থপতি?
ইনফান্তিনোর দশ বছর তাই দ্বিমুখী গল্প।
একদিকে আর্থিক পুনরুত্থান, উন্নয়ন তহবিলের বিস্তার, বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ। অন্যদিকে মানবাধিকার বিতর্ক, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, টিকিটের উচ্চ মূল্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।
দশ বছর পর ফিফা আর কেবল দুর্নীতির প্রতীক নয়—বরং এক আর্থিক শক্তিকেন্দ্র।
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়: এই শক্তি কি ফুটবলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য, নাকি ক্ষমতার কাঠামোকে আরও দৃঢ় করার জন্য?
সমালোচনার মাঝেও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখনও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে, এবং আপাতত প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।