উত্তরের অবহেলা থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ: বোদো/গ্লিম্টের অবিশ্বাস্য যাত্রা

নরওয়ের উত্তরের ছোট্ট এক শহর বোদো—জনসংখ্যা মাত্র পঞ্চাশ হাজারের একটু বেশি। শীতকালে যেখানে গড় তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের নিচে, সূর্যের আলোও ঠিকমতো দেখা মেলে না। সেই শহরের ফুটবল ক্লাবই সান সিরোর আলো ঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউটে বিদায় করল ইউরোপের জায়ান্ট ও গত আসরের রানার্সআপ ইন্টার মিলানকে। আর তাতেই তৈরি হলো ইতিহাস—চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট টাই অতিক্রম করা প্রথম নরওয়েজিয়ান দল এখন বোদো/গ্লিম্ট।
এটা কি অলৌকিক? না কি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সংস্কৃতি আর বিশ্বাসের ফসল? ক্লাবটির কোচ যেটিল নুটসেনের কথায় এটি অলৌকিক না এটি তাদের যাত্রার ফসল।
উত্তরাঞ্চলের অবহেলা থেকে ইউরোপের মানচিত্রে
আজ থেকে কয়েক দশক আগেও নরওয়ের উত্তরাঞ্চলের ক্লাবগুলোকে মূলধারার ফুটবল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন রাখা হতো। ভৌগোলিক দুর্ভোগ, দীর্ঘ যাত্রা আর কঠিন আবহাওয়ার অজুহাতে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বোদো/গ্লিম্ট প্রথম বিভাগে খেলতেই পারত না। ক্লাবটির ক্রীড়া পরিচালক হাভার্ড সাকারিয়াসেন স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে বলেন, ‘নরওয়ের উত্তরকে একসময় প্রান্তিক ভাবা হতো—ভৌগোলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে।’
কিন্তু সেই প্রান্তিকতাই যেন শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের পর থেকে নিজেদের মাঠে ৪৪ ম্যাচে ৭৫ শতাংশ জয়ের হার—রোমা, পোর্তো, লাৎসিও, ম্যানচেস্টার সিটি—অনেকেই এই আর্কটিক সার্কেলের এই ঠান্ডায় এসে থমকে গেছে।
২০ মিলিয়নের দল, ইউরোপ কাঁপানো স্বপ্ন
২০১৭ সালে শীর্ষ লিগে উঠার পর কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন নুটসেন। তার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে ক্লাবের চেহারা। ২০১৭ সালে যেখানে আয় ছিল মাত্র ৪.২ মিলিয়ন ইউরো, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ মিলিয়নে। তবু স্কোয়াডের মোট বাজারমূল্য মাত্র ২০ মিলিয়নের আশেপাশে—চারজন মাত্র আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়।
দলের বড় অংশই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ফুটবলার। ব্যয়বহুল তারকার চেয়ে তারা বেছে নিয়েছে কাঠামো, শৃঙ্খলা ও দলীয় সংস্কৃতি। সাকারিয়াসেনের ভাষায়, “আমরা যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, তাতে আমাদের গভীর বিশ্বাস আছে।”
হাউগের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ
এই রূপকথার অন্যতম নায়ক হ্যান্স পিটার হাউগে। ২০২০ সালে মিলান তাকে দলে নেয়, ইউরোপা লিগে ঝলক দেখানোর পর। পরে আবার ছেড়ে দিলে তিনি ফিরে আসেন নিজের শহরে। সান সিরোতে ইন্টারকে বিদায় করার ম্যাচে গোল করে যেন ব্যক্তিগত এক প্রতিশোধও পূরণ করলেন। ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠে ছিল গর্ব, ‘এটা অসাধারণ রাত। আমরা যা অর্জন করছি, তাতে আমরা গর্বিত।’
ইতিহাসের দরজায়
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্ব শেষ হওয়ার দুই ম্যাচ বাকি থাকতে তাদের প্লে-অফে না ওঠার সম্ভাবনা ছিল ৯৯.৭ শতাংশ। এরপর একে একে বড় দলগুলোকে চমকে দিয়ে তারা এখন শেষ ষোলোতে। সামনে আবার ম্যানচেস্টার সিটি বা স্পোর্টিং সিপি—নতুন চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু বোদো/গ্লিম্টের গল্প শুধু জয়ের নয়। এটি বিশ্বাসের গল্প। ছোট শহরের মানুষের স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প। যেখানে ফুটবল শুধু খেলা নয়—একটি সংস্কৃতি, একটি ঐক্য, একটি যাত্রা।
নুটসেনের কথায়, “ফুটবল দলগত খেলা। আপনাকে দল নিয়েই ভাবতে হবে।”
আর হয়তো এ কারণেই, আর্কটিকের ঠান্ডা শহর থেকে উঠে আসা এই দলটি এখন ইউরোপের সবচেয়ে উষ্ণ আলোচনার বিষয়।